সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল উত্তপ্ত: চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার গুরুতর অভিযোগ

প্রকাশিত: ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২৬

সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল উত্তপ্ত: চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার গুরুতর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট নগরীর বাগবাড়িতে অবস্থিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, এতিম ও অবহেলিত শিশুদের অন্যতম আশ্রয়স্থল ‘সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল এন্ড কলেজে’ শিক্ষা ও প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিশেষায়িত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালনায় সমাজকল্যাণ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে মূলত সরকারি শিশুনিবাসের এতিম ও প্রতিবন্ধী শিশু এবং স্থানীয় নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। ২০১৯ সালের সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বারবার ক্ষমা পাওয়ার সুযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট নথি, জেলা শিক্ষা অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন এবং শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের চলমান বিশৃঙ্খলার জন্য সহকারী শিক্ষক আকলিমা বেগম এবং তিন খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

নিয়োগ যোগ্যতা ও ছুটি নিয়ে প্রশ্ন

নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নিয়োগের সময় ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রির শর্ত থাকলেও আকলিমা বেগম তখন এইচএসসি পাস ছিলেন। তাঁর স্বামী সে সময় সমাজসেবা অধিদপ্তরে কর্মরত থাকায় মানবিক বিবেচনায় তাঁকে শর্তসাপেক্ষে নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে চাকরিতে যোগদানের পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের তথ্য গোপন করে তৃতীয় সন্তানের সময়ে দ্বিতীয়বার মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়া এবং এর মাধ্যমে সরকারি অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অনার্স, মাস্টার্স, বিএসএড ও এমএসএড পরীক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ছুটি ভোগ এবং প্রতিষ্ঠানটি এনডিডি (নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি) কেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও অপ্রাসঙ্গিক নন-এনডিডি কোর্সে অংশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।

খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য করা এবং প্রতিষ্ঠানে অস্বস্তিকর কর্মপরিবেশ তৈরির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, চার শিক্ষক মিলে প্রতিষ্ঠানে একটি অঘোষিত প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। তারা নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিয়ে গোপন বৈঠক করতেন এবং শিক্ষক মিলনায়তনে নারী শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ফারজানা ইসরাত এসব অনিয়মের বিষয়ে পরিচালনা কমিটির কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর অভিযোগের পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় অভিযুক্ত শিক্ষকরা সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে নামে-বেনামে অভিযোগ ও অপপ্রচার চালান। পরে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়া ফারজানা ইসরাত তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও প্রতিশোধমূলক অপপ্রচার হিসেবে দাবি করেছেন।

প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিদ্যালয়ের ফাইলপত্রে আগের বেশ কিছু অভিযোগপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছেন। এসব নথি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক, নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে তারা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত আবেদনও দিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক আকলিমা বেগম নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে একাধিক মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে তিনি করোনা পরিস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, তিন খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিন তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে নিজেদের মধ্যে একটি বিশেষ বলয় বা গ্রুপিং থাকার বিষয়টি তারা স্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির এমন পরিস্থিতিতে সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত না করে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক, নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2026
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..