ধীরগতিতে চলছে ২১৭ কোটির সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কার কাজ

প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২৬

ধীরগতিতে চলছে ২১৭ কোটির সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কার কাজ

আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক :: দীর্ঘ চার বছর বন্ধ থাকার পর সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু হলেও ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ ২৩ আগস্ট। অথচ এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ হয়‌নি । এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট-ছাতক রেলপথের বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন পর সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় ছাতক, বিশ্বনাথ ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু কাজের ধীরগতি সেই আশাকে অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত মিটার গেজ রেলপথ সংস্কারের জন্য ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়।

এ প্রকল্পের আওতায় সিলেট-ছাতক রেলপথের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কাজ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কার কাজ বন্ধ র‌য়ে‌ছের । কোথাও মাটি ভরাট করা হচ্ছে, আবার কোথাও পুরোনো রেললাইন ও স্লিপার সরানো হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ছাতক থেকে খাজাঞ্চী পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি রয়েছে। ফলে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও পুরো রেলপথে ট্রেন চলাচল কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের আওতাধীন ৯৬টি ফাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও চলছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় বাকি কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই প্রকল্পের গতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সমন্বয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে সমন্বয় না হওয়ায় কিছু এলাকায় কাজ পিছিয়েছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সাত্তার বলেন, “অনেক বছর পর রেলপথের কাজ শুরু হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ হোক। আবার ট্রেন চলাচল শুরু হোক। দীর্ঘদিন ধরে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”

ছাতক প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রনি বলেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, ছাতকের বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনেও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।

দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সংস্কারকাজ শেষ করে রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু করা হলে ছাতকের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি ফিরবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও কমবে। ঐতিহাসিকভাবে সিলেট-ছাতক রেলপথের গুরুত্ব অনেক। ১৯৫৪ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত এই রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে এই রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি স্বল্প খরচে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের জন্য এই ট্রেন ছিল সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান ভরসা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, রেলপথ বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে। রেল যোগাযোগ চালু হলে একদিকে যেমন যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে ছাতকের শিল্প ও বাণিজ্য খাতও উপকৃত হবে।

এদিকে প্রকল্পের মেয়াদ ২৩ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ হওয়ায় পুরো প্রকল্প শেষ করতে আরও সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজের গতি কতটা বাড়বে এবং নতুন সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

সিলেট রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, “৯৬টি ফাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও দ্রুত চলছে।”এ প্রক‌ল্পের ২৫ ভাগ হ‌চ্ছে। বাকী ৭৫ভাগ কাজ ক‌বে হ‌বে কেউ ব‌লতে পার‌ছেন না ।
তবে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ গত ২৩ আগস্ট শেষ হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই রেলপথ নিয়ে আর যেন সময়ক্ষেপণ না হয়। দ্রুত প্রয়োজনীয় জটিলতা নিরসন করে কাজের গতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার না হয়, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।

তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করে সিলেট-ছাতক রেলপথে আবারও ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এতে শুধু যাত্রীদের যোগাযোগব্যবস্থাই স্বাভাবিক হবে না, ছাতকের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনেও নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2026
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..