মেয়াদ শেষ, কাজ মাত্র সিকিভাগ: অনিশ্চয়তায় ঐতিহ্যবাহী সিলেট-ছাতক রেলপথ

প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬

মেয়াদ শেষ, কাজ মাত্র সিকিভাগ: অনিশ্চয়তায় ঐতিহ্যবাহী সিলেট-ছাতক রেলপথ

ছাতক প্রতিনিধি :: দীর্ঘ চার বছর পর সিলেট-ছাতক রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরুর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন স্থানীয়রা, নির্ধারিত সময়েও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে নেওয়া রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ গত ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে।

প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথের পুনর্বাসনকাজ হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। নতুন রেললাইন স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ কাজ এখনো বাকি থাকায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরুর সময় নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথটি নির্মাণ করা হয় ১৯৫৪ সালে। দীর্ঘদিন ধরে এ রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমই ছিল না, ছাতকের চুনাপাথর, সিমেন্ট, বালি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জেলার বিভিন্ন খাদ্যগুদামের মালামালও একসময় রেলপথে ছাতক এসে পরে নৌপথে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো।
তবে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় রেললাইনের লোহার পাত, স্লিপার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনাও প্রতি‌নিয়ত
ঘটে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, জিওবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প’ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরে ২০২৫ সা‌লে ৩ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের (এমএএইচএল) সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১৭ কোটি টাকা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিমূল্য প্রায় ১৯৯ কোটি টাকা।

প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন, নতুন রেললাইন বসানোসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ রয়েছে। ইতোমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ মূল কাজের বড় অংশ এখনো অসম্পন্ন।

ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, তাজপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ ধীরগতিতে চলছে বা কোথাও কোথাও বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রকল্পের প্রায় ২০ শতাংশ কাজ বাস্তবায়নের কথা জানালেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপকের হিসাবে কাজ হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এ অবস্থায় নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ছাতকের পাথর ব্যবসায়ী সদস‌্য নাজমুল ইসলাম নজমুল বলেন, “ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে এ রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সংস্কার শুরু হওয়ার পরও কাজের গতি আশানুরূপ নয়। মাটি ভরাট ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাজ আমাদের চোখে পড়ছে না। এতে ব্যবসায়ীদের সড়কপথে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

গোবিন্দগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী আশরাফুর রহমান এনাম বলেন, রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু হলে মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন কাজ চলার পর বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম অনেকটাই থেমে গেছে। কেন কাজ বন্ধ বা ধীরগতিতে চলছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছে না।

কৃঞ্চনগর গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, “একসময় ছাতক ও দোয়ারাবাজারের অনেক শিক্ষার্থী ট্রেনে করে সিলেটের এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজ ও টেকনিক্যাল কলেজে যাতায়াত করতেন। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি বেড়েছে।”

এদিকে প্রকল্পে ধীরগতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের নানা অভিযোগ থাকলেও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মোবাইল বন্ধ থাকার তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, “৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও চলছে। প্রকল্পের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে, বাকি রয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। মেয়াদ বৃদ্ধি ও পরবর্তী বাস্তবায়নের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ স‌ঠিক ক‌রে বলতে পারবেন।”
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও যখন নতুন ট্র্যাকই পুরোপুরি বসানো হয়নি, তখন কবে নাগাদ সিলেট-ছাতক রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হবে-এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মিলছে না। ফলে ৭২ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী রেলপথ ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে তা কবে আলোর মুখ দেখবে, সেটিই এখন সিলেট ও সুনামগঞ্জের মানুষের বড় প্রশ্ন।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2026
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..