মা বাবার সন্ধানে জকিগঞ্জের মানসুরার ৩৬ বছর

প্রকাশিত: 9:54 PM, March 3, 2019

মা বাবার সন্ধানে জকিগঞ্জের মানসুরার ৩৬ বছর

Sharing is caring!

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন, জকিগঞ্জ :: মানসুরার জন্ম বরিশালে কোনো একটি গ্রামে। পাঁচ কি ছয় বছর বয়সে দূর সম্পর্কের এক নানির বাসায় থেকে পড়তে গিয়েছিলেন ঢাকায়। সেখান থেকেই হারিয়ে যান একদিন। সিলেটের এক প্রবাসীর সহায়তায় চলে আসেন সিলেটে। তারপর বিয়ানীবাজারের আলীনগরে বড় হন তিনি। সেই মানসুরার বয়স এখন ৩৬। বিয়ে হয়েছে জকিগঞ্জের বারহালে। ৪ সন্তানের জননী মানসুরা প্রতিনিয়ত শেকড়ে টান অনুভব করলেও খুঁজে পাচ্ছেন না মা-বাবা ও ভাই-বোনদেরকে।

ছোট বেলায় হারিয়ে যাওয়া মানসুরার বাবার নাম তালেব হোসেন উরফে তালেপ মিয়া মায়ের নাম ফিরোজা বেগম। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ছোটবোন ঊর্মী ও ছোটভাই বক্করের নাম মনে থাকলেও ভুলে গেছেন সবার ছোটভাইর নাম। তিনি জানেন না তার গ্রাম এমনকি উপজেলা নামও। তার বাড়ি বরিশাল এবং নানাবাড়ি বরিশালের মুঙ্গাহাটি। ইঞ্জিনের নৌকায় মুঙ্গাহাটি যেতে হতো নিজ বাড়ি থেকে। মানসুরার দিনমজুর বাবা তালগাছে, খেজুরগাছের গাছি হিসেবে কাজ করতেন। খেজুরের রস বিক্রি করতেন বাড়ি বাড়ি। তার মায়ের চেহারা তার মতোই দেখতে। মানসুরা জানান, ঢাকায় তার ওই আত্মীয়ের বাসা ছিল কলাবাগানে। ঢাকায় যাবার তিন দিনের মাথায় দুতলা বাড়ির নিচতলায় গেইটের বাইরে চলে আসলে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন। কান্নারত অবস্থায় এক মহিলা মানসুরাকে পেয়ে তার বাসায় নিয়ে যান। সেখানে মানসুরা কাজ করতে না পারায় তাকে ওই মহিলা মারধর করায় সেখান থেকে মানসুরা বের হয়ে যান অজানার উদ্দেশ্যে। পরে ঢাকার কলাবাগানে এক পুলিশের হাতে পড়েন মানসুরা।

ঐ পুলিশ সদস্য সারাদিন তাকে সাথে নিয়ে ঘুরাফেরা করেন মানসুরাকে তার নানির কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। ব্যর্থ হয়ে ওই পুলিশ সদস্য মানসুরাকে সিলেটের এক প্রবাসীর হাওলা করেন। বিয়ানীবাজারের আলীনগরের শাহাদত হোসেন চৌধুরী নামের ঐ ব্যক্তির আশ্রয়ে মানসুরা লালিতপালিত হন। শাহাদত হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী রিপা বেগমকে মানসুরা মামী বলে ডাকেন। মানসুরার কপালে লেখাপড়া না জুটলেও বিয়ানীবাজারেই বেড়ে উঠেন তিনি। ২০০২ সালে মানসুরার বিয়ে হয় জকিগঞ্জের বারহালে। মানসুরার স্বামী খিলগ্রামের মৃত আনসার কমান্ডার মাহমুদ আলীর ছেলে আজমল হোসেন পেশায় একজন ঠেলাগাড়িরচালক। বর্তমানে তিনি অন্ধ এবং ভিক্ষা করে সংসার চালাচ্ছেন। মানসুরার চার ছেলে মেয়ে হচ্ছে, জুবেদা আক্তার জুঁই (১৪), আল আমিন জুয়েল (১২), জবা বেগম (১০) ও ইয়ামিন আহমদ সুহেল (৪)। টাকা পয়সার অভাবে মানসুরার বাচ্চারা ঠিক মতো লেখাপড়া করতে পারছে না।

মানসুরাকে লালনপালনকারী শাহাদাত হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী রিপা বেগম বলেন, আমরা যখন মানসুরাকে পাই তখন সে খুবই ছোট ছিল। সে তার নাম ঠিকানা কিছুই বলতে না পারায় আমরা ওর বাবা-মার সন্ধান করতে পারিনি।

আলাপকালে মানসুরা জানান, ছেলেবেলার তেমন কোনো স্মৃতিই মনে নেই তার। দুর্ভাগ্য আর অভাবের সাথে লড়াইর কথা তিনি ভুলে যাবেন যদি মৃত্যুর আগে একবার বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের দেখা পান। নাটাই ছেঁড়া ঘুড়ির মতো জীবনে সব সময়ই তাকে তাড়া করে ফিরেছে বাবা-মায়ের পরিচয় জানার আকুতি। আদৌ স্বজনদের দেখা পাবেনন কি না তার নিশ্চয়তা নেই, তবু আশাবাদী মানসুরা।

মানসুরা বলেন মনে হয় তাদের পেলেই জীবনটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। আমি চোখ বন্ধ করে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস নিলেই, মনে হয় আমার সেই স্বজনদের গন্ধ পাচ্ছি।’ মানসুরা আরো বলেন, ‘শেকড়ের কথা মনে হলে আমি প্রচন্ড শূন্যতা অনুভব করি। যদি বাবা-মায়ের খোঁজ পাই তাহলে সেটা হবে বেহেস্ত পাওয়ার সমান।

জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, চার দশক আগের বরিশালে এখন ছয়টি জেলা। পুরো বিভাগের কোথায় মুঙ্গাহাটি তা বলা সত্যিই কঠিন। গণমাধ্যমের সহযোগিতায় মানসুরার ইচ্ছা পূরণের চেষ্টায় হয়তো সফল হওয়া অসম্ভব নয়। বরিশালের পুলিশ সুপার মো.সাইফুল ইসলাম বিপিএম বলেন, ঘটনাটি শুনে মানসুরার সাথে পরিবারের সদস্যদের মিলন ঘটাতে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু পত্রিকায় বক্তব্য দেয়ার মতো এখনো সময় হয়নি। আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে পারি। সূত্র : সবুজ সিলেট 

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares