সিলেট | |
প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের চেঙ্গেরখাল নদীতে ইউনিয়ন পরিষদ ও মার্কম্যান ট্যাক্সের নামে নৌযান থেকে দেদারসে চলছে চাঁদা আদায়। জাল কাগজপত্র ও ভুয়া রশিদের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে এখানে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র। সম্প্রতি নৌপুলিশের অভিযানে চাঁদাবাজ চক্রের একজন হাতেনাতে গ্রেফতার এবং মামলা দায়ের হলেও, চাঁদাবাজির মূলহোতা কবির আহমদ এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি পুনরায় নদীতে চাঁদাবাজি শুরু করায় নৌযান শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সিলেট সদরের চেঙ্গেরখাল নদীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক রুট। বর্ষা মৌসুমসহ সারা বছরই ভোলাগঞ্জ ও জাফলং থেকে উত্তোলিত বালু ও পাথর পরিবহনের জন্য হাজার হাজার নৌযান এই পথ ব্যবহার করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সালুটিকর-বাদাঘাট নৌপথে নৌ-শ্রমিকদের জিম্মি করে চলছে চাঁদাবাজি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বর্ষা এলেই জাল কাগজপত্র ও ভুয়া লিজের অজুহাতে চাঁদার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবি, এয়ারপোর্ট থানাধীন নোয়াটিলা গ্রামের মৃত সুনু মিয়ার ছেলে কবির আহমদ এই চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতা। নিজেকে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ‘মার্কম্যান’ পরিচয় দিয়ে কবির নদীতে এই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম জানান, চেঙ্গেরখাল এলাকায় কবির নামে কোনো মার্কম্যান দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
গত ১৯ জুন বালু-পাথর ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান বিলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সালুটিকর ব্রীজ সংলগ্ন চেঙ্গেরখাল নদীতে ঝটিকা অভিযান চালায় ছাতক নৌপুলিশ। অভিযানকালে চাঁদাবাজির সময় হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয় কবিরের ভাই মামুন মিয়াকে। এ সময় চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকা, ‘আসফিয়া এন্টারপ্রাইজ খাদিমনগর ইউনিয়ন’ ও ‘বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন’ নামাঙ্কিত দুটি ভুয়া ট্যাক্স আদায়ের রশিদ বই, নগদ ২,২২০ টাকা এবং তিনটি বাঁশের লাঠি জব্দ করা হয়।
এই ঘটনায় আজিজুর রহমান বিলাল বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় ৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে আসামি করে একটি চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-২১, তারিখ: ১৯/০৬/২০২৬ ইং)।
নদীতে ইউনিয়ন পরিষদের নামে অর্থ আদায়ের কোনো বৈধতা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ৩নং খাদিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ দিলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, চেঙ্গেরখাল নদীতে ইউপি ট্যাক্স আদায়ের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়া হয়নি। ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মামলার পর আটক মামুন মিয়াকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হলেও, প্রধান আসামি কবির আহমদকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয় সূত্র জানায়, মামলার পর সপ্তাহখানেক চাঁদাবাজি বন্ধ রাখলেও, পরিস্থিতি কিছুটা ঠাণ্ডা হতেই কবির আবারও তার বাহিনী নিয়ে নদীতে নেমে পড়েছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কবির আহমদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি “কিছু জানেন না” বলে দ্রুত লাইনটি কেটে দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাতক নৌপুলিশের এসআই জয়ন্ত চন্দ্র দে জানান, নৌপথে চাঁদাবাজির মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। আসামিদের গ্রেফতার এবং চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ ওমর ফারুক জানান, মামলাটির তদন্তভার নৌপুলিশের কাছে রয়েছে। তবে চাঁদাবাজির বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এয়ারপোর্ট থানার ওসি শহিদুর রহমান ও সিলেট সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরকার মামুনুর রশীদ জানান, ভুয়া কাগজের মাধ্যমে নদীতে চাঁদাবাজির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেহেতু মামলা হয়েছে, তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে।
ভুক্তভোগী নৌ-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, চেঙ্গেরখাল নদীকে চাঁদাবাজমুক্ত করতে কেবল অভিযান নয়, মূলহোতা কবিরসহ পুরো চক্রকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd