ড্রেজার দানব ও পেলোডারে গিলে খাচ্ছে গোয়াইনঘাট: হুমকির মুখে চা-বাগান, বসতভিটা ও খেলার মাঠ

প্রকাশিত: ১:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২৬

ড্রেজার দানব ও পেলোডারে গিলে খাচ্ছে গোয়াইনঘাট: হুমকির মুখে চা-বাগান, বসতভিটা ও খেলার মাঠ

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের গোয়াইনঘাটে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের শর্তে ইজারা নিয়ে চলছে ড্রেজার ও পেলোডার মেশিনের তাণ্ডব। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দিন-রাত হাজার হাজার ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। এর ফলে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, ভাঙনের মুখে পড়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি ও চা-বাগানের ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ। অবৈধ এই বালু বাণিজ্যের দৈনিক বাজারমূল্য প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছর পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের নবসৃষ্ট হাজিপুর বালু মহালের ইজারা পায় মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ, যার স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ। শর্ত অনুযায়ী লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপুর মৌজা থেকে সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে বালু তোলার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
তদুপরি, ইজারা এলাকার বাইরে গিয়ে পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের উত্তর প্রতাপপুর, লুনি ও আমবাড়ি এলাকায় দিবারাত্রি কয়েক হাজার অবৈধ ড্রেজার মেশিন (দানবযন্ত্র) বসিয়ে বালু লুটপাট করা হচ্ছে। নদীপথে প্রতিদিন শত শত বাল্বহেড ও কার্গো বোঝাই করে এই বালু পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

পেলোডার ও ড্রেজার দিয়ে পিয়াইন নদীর আনন্দ খাল এলাকায় যত্রতত্র গভীর গর্ত করে বালু তোলায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর ফলে মালিকানাধীন লুনি ফুটবল মাঠসহ স্থানীয় তিনটি খেলার মাঠ এখন বিলীনের অপেক্ষায়। লুনি গ্রামের অমৃকা লাল, কুলন্দ নাথ এবং দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ অনেকের বসতভিটা যেকোনো মুহূর্তে নদীতে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে হাজীপুর এলাকায় নদী ভাঙনের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন হেলেনা বেগম ও তরিক উল্লাহর মতো সাধারণ মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবৈধ বালু উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছে ৪০-৫০ জনের একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী চক্র। চক্রের অন্যতম মূলহোতা লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ ও দেলোয়ার হোসেন। বিগত এক যুগে খায়রুল ও কামরুলদের বিরুদ্ধে ২৫-৩০টি মামলা হলেও, বাদীকে চাপ প্রয়োগ ও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে তারা পার পেয়ে গেছে। সর্বশেষ গত ১৩ জানুয়ারি বালু তোলায় বাধা দেওয়ায় দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুলকে মারধর করা হয়, যার প্রেক্ষিতে খায়রুল ও নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বারবার লিখিত আবেদন জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ও এমদাদুর রহমানসহ স্থানীয় এলাকাবাসী। এমনকি সহকারী কমিশনারের কার্যালয় থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের চিঠি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। তবে অভিযুক্ত খায়রুল আমিন ও ইজারাদার হাফিজ আব্দুল্লাহ এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, “বালু উত্তোলনে খায়রুলসহ একটি চক্র জড়িত রয়েছে। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

পরিবেশ ও জনপদ রক্ষায় এই “ড্রেজার সিন্ডিকেট”-এর বিরুদ্ধে অবিলম্বে টাস্কফোর্সের কঠোর ও স্থায়ী আইনি পদক্ষেপ কামনা করছেন চরম আতঙ্কে দিন কাটানো স্থানীয় এলাকাবাসী।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

June 2026
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..