সিলেট | |
প্রকাশিত: ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদক: পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের জের ধরে সিলেটে এক দুর্ধর্ষ চোরাকারবারি ও সন্ত্রাসী চক্রের চরম আক্রোশের শিকার হয়েছেন ‘জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রায়হান হোসেন। খোদ পুলিশের নাকের ডগা থেকে সশস্ত্র অবস্থায় এই সাংবাদিককে অপহরণ করা হলেও, পরম সৌভাগ্য ও অসীম সাহসিকতার বদৌলতে তিনি কুমিল্লার দেবিদ্বার থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরেন। এই রোমহর্ষক ঘটনাটি একদিকে যেমন স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তা স্থানীয় শাহপরাণ (রহ.) থানা পুলিশের চরম অপেশাদারিত্ব ও সন্দেহজনক নিষ্ক্রিয়তার এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে।
থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও আইনের প্রতি চূড়ান্ত বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অপরাধী চক্রটি। গত ৭ জুলাই, ২০২৬ইং দিবাগত রাত আনুমানিক ১:৩৭ মিনিটে শুরু হয় তাদের পূর্বপরিকল্পিত ছকের বাস্তবায়ন। ছিনতাই মামলার আসামিরা সুকৌশলে জরুরি আলাপের মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে সাংবাদিক রায়হানকে নিজ বাসগৃহের বাইরে ডেকে আনে। সরল বিশ্বাসে তিনি গৃহের চৌকাঠ পেরোতেই পূর্ব থেকে ওঁত পেতে থাকা ১নং আসামি আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে ৩-৪ জনের একদল সশস্ত্র ও পেশাদার সন্ত্রাসী তাকে চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। বেআইনি জনতাবদ্ধ হয়ে পেশিশক্তির বীভৎস মহড়া ও প্রাণনাশের ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক তারা রায়হানকে জোরপূর্বক একটি অজ্ঞাত কালো মাইক্রোবাসে তুলে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ধাবিত হয়। মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ছুটে চলা মাইক্রোবাসটি রাত গড়িয়ে ভোরে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানাধীন ‘চরবাকর’ নামক এক নির্জন স্থানে পৌঁছালে, অপহরণকারীরা সাময়িক বিরতি ও চা-নাস্তা গ্রহণের নিমিত্তে গাড়ি থামায়। এই ক্ষুদ্র অসতর্কতার সুবর্ণ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিক রায়হান জীবনের চরম ঝুঁকি গ্রহণ করেন। অসীম প্রত্যয় ও উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে তাদের দুর্ভেদ্য বেষ্টনী ভেদ করে পলায়ন করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে স্থানীয় এক সহৃদয় নাগরিকের সহায়তায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিকটবর্তী দেবিদ্বার থানা পুলিশের শরণাপন্ন হয়ে নিজের প্রাণরক্ষা করেন।
এই বর্বরোচিত অপহরণের পটভূমি রচিত হয়েছিল গত ১৪ মে, ২০২৬ইং তারিখে। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশু ক্রয় করতে গিয়ে সিলেটের জৈন্তাপুর থানাধীন চিকনাগুলে এক সংঘবদ্ধ দস্যুদলের কবলে পড়েন রায়হান। তার গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে ১ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা এবং ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি লুণ্ঠন করা হয়। এই মর্মে গত ১৯ মে জৈন্তাপুর মডেল থানায় একটি দস্যুতার মামলা (মামলা নং ১১, ধারা ৩৯২) দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত ও আসামি জুয়েলকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়ংকর সত্য। উন্মোচিত হয় যে, এই লুণ্ঠনের নেপথ্যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে হরিপুর এলাকার কুখ্যাত চোরাকারবারি মঈনুলের বিশ্বস্ত ‘লাইনম্যান’ ও বেতনভুক্ত ক্যাডার আক্তার এবং রুবেল। এই দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেটের চোরাচালান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পত্রিকায় ধারাবাহিক ও নির্ভীক সংবাদ প্রকাশ এবং ছিনতাই মামলায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলেই প্রতিশোধের অন্ধ নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে অপরাধী চক্রটি।
প্রতিহিংসার মাত্রা এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, গত ৩ জুলাই জুমার নামাজের পর প্রকাশ্যে দিবালোকে সন্ত্রাসী আক্তার হোসেন সাংবাদিক রায়হানের মাত্র ৬ বছর বয়সী শিশুপুত্র সাইফুল ইসলাম রাতুল ও তার মামাতো ভাইয়ের পথরোধ করে। অবুঝ শিশুর সম্মুখে দাঁড়িয়ে চরম ঔদ্ধত্যের সাথে সে হুমকি প্রদান করে যে, “সাংবাদিক রায়হানকে তো খুন করবই, সেই সাথে তার তিন সন্তানের মধ্যে যেকোনো শিশুকে অপহরণ করে খুন করে লাশ গুম করে ফেলবো।” এই পৈশাচিক হুমকির পর শিশু রাতুল চরম মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা (Post-Traumatic Stress Disorder) বা ভীতির শিকার হয়ে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছে। গত ১০ দিনের অধিক সময় ধরে ভয়ে সে গৃহের বাইরে পদার্পণ করতে পারছে না; এমনকি তার নিয়মিত মসজিদ-মাদ্রাসায় গমনও সম্পূর্ণ রূপে স্থগিত হয়ে গেছে।
কুমিল্লার দেবিদ্বার থানা পুলিশ ও সিলেটের শাহপরাণ থানা পুলিশের ভূমিকার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে এক বিস্তর ফারাক। দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান চরম পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিককে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং পুলিশের কঠোর পাহারায় তাকে সিলেটে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, যেহেতু অপরাধের উৎপত্তিস্থল শাহপরাণ থানা এলাকা, তাই আইনগত ব্যবস্থা সেখান থেকেই গৃহীত হতে হবে। বিপরীতক্রমে, শাহপরাণ (রহ.) থানা পুলিশের ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
গত ৪ জুলাই থানায় জিডি (নং-১৪৬) দায়ের হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা। এমনকি অপহরণের পর গত ৮ জুলাই রায়হান হোসেন লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে গেলে, থানার ওসি ছুটিতে থাকার অর্বাচীন অজুহাতে পরিদর্শক (তদন্ত) মনজুরুর রহমান ভুক্তভোগীর বৃদ্ধা মাকে থানায় বসিয়ে রেখে চরম মানসিক হয়রানি করেন। মামলা এফআইআর (FIR) হিসেবে রেকর্ড না করার বিষয়ে তিনি ‘সার্ভার ত্রুটি’র মতো হাস্যকর ও খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপন করেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন স্পর্শকাতর ঘটনায় পুলিশের এই কালক্ষেপণ সচেতন নাগরিক মহলে চরম ক্ষোভের উদ্রেক করেছে।
সাংবাদিক রায়হান দৃঢ়ভাবে আশঙ্কা করছেন যে, সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের সাথে শাহপরাণ থানার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার অবৈধ অর্থনৈতিক আঁতাত ও গভীর সখ্য রয়েছে। বর্তমানে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং রায়হান ও তার পরিবার চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নিজ গৃহে একপ্রকার গৃহবন্দি জীবনযাপন করছেন। তাদের স্বাভাবিক প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড ও সন্তানদের শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ রূপে অবরুদ্ধ। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত আক্রমণ স্বাধীন সাংবাদিকতার পবিত্র সত্তার ওপর এক সুকঠিন ও নগ্ন আঘাত। এই দুর্ধর্ষ চোরাকারবারি চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানে ভুক্তভোগী পরিবার পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (IGP), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রশাসন কালবিলম্ব না করে এই সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন না করলে যেকোনো মুহূর্তে সাংবাদিক রায়হান বা তার পরিবারের ওপর পুনরায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রাণনাশের ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়িত হতে পারে বলে সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক মহল প্রবল আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ক্ষতি সাধিত হলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার প্রশাসনকেই বহন করতে হবে বলে ভুক্তভোগী পরিবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd