দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে দুদক

প্রকাশিত: ৮:৫৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০১৮

দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে দুদক

Sharing is caring!

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুধু বিরোধী দল নয় বরং সরকারি দলের এমপিদের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করছে দুদক। এছাড়া আমলা, ব্যাংকার এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা খাতসহ সব জায়গায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সক্রিয় রয়েছে সংস্থাটি। এরই অংশ হিসেবে বিরোধী দল ও সরকারি দলের অন্তত ১০ এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক বজলুল হক হারুনকে (বিএইচ হারুন) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে মঙ্গলবার নোটিশ পাঠিয়েছে দুদক।

নোটিশ অনুযায়ী তাকে ১১ এপ্রিল সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খুলনা-২ আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, লালমনিরহাটের সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা আসাদুল হাবিব দুলু এবং নাটোরের সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস দুলুর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। ১২৫ কোটি টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে বিএনপির শীর্ষ ৮ নেতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

এরা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, সহ-সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, এম মোর্শেদ খান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও নির্বাহী সদস্য তাবিথ আউয়াল। ৩০ দিনে তাদের

অ্যাকাউন্টে ওই পরিমাণ টাকা লেনদেন হওয়ার বিষয়টি নজরে এলে দুদক এ অনুসন্ধানে নামে বলে জানা গেছে।
এছাড়া, ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। মঙ্গলবার এক চিঠিতে ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীসহ (বাবুল চিশতী) ১৭ জনের বিশেষ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুদক। এর আগেও একইভাবে এবি ব্যাংকের ১২ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিভিল এভিয়েশনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে দুদক। এদিকে, সরকারি আমলাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে খাদ্য বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে যুগ্ম সচিব, উপ-সচিবসহ শীর্ষস্থানীয় আট আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সংস্থাটি। অপরদিকে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি সেবা সেক্টরে দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের জিরো টলারেন্স প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক শূন্য সহিষ্ণুতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অবলম্বন করবে। তিনি বলেন দুদকে সরকার আর বিরোধী দল বলে কোনো শব্দ নেই। দুদকের কাছে সবাই সমান। যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসুক না কেন অনুসন্ধানের পরই সত্য বেরিয়ে আসবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের শূন্য সহিষ্ণুতার কার্যক্রমে এরই মধ্যে সরকারি দলসহ বিভিন্ন দলের অন্তত ১০ এমপির দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।

এরই অংশ হিসেবে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক বজলুল হক হারুনকে (বিএইচ হারুন) তলব করেছে দুদক। দুদকের উপ-পরিচালক শামসুল হকের সই করা চিঠি মঙ্গলবার পাঠানো হয়। চিঠিতে বিএইচ হারুনকে ১১ এপ্রিল দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে। এর আগে ৮ মার্চ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খুলনা-২ আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, লালমনিরহাটের সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা আসাদুল হাবিব দুলু এবং নাটোরের সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস দুলুর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এজন্য দুদকের পৃথক তিনটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। এ তিনটি অনুসন্ধানী টিম তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া, জাতীয় পার্টির এমপি মেহজাবিন মোর্শেদ ও তার স্বামী চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ডবলমুরিং থানায় মামলা করে দুদক। এছাড়া, ময়মনসিংহের একজন এমপির বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকার জিআর চাল আত্মসাতের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের একজন এমপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগে, শরীয়তপুরের একজন এমপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ এবং সরকারের আমদানি করা সার পরিবহনে অনিয়ম ও গুদামে সার সরবরাহ না করে বাইরে পাচার ও বিক্রির অভিযোগে, নরসিংদীর একজন এমপির অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।

খাদ্য অধিদপ্তরে বিভিন্ন পদে ৪৪ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) ইলাহী দাদ খানসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের অক্টোবরে মামলা করে দুদক। পরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পাট-২ অধিশাখা) নাসিমা বেগম (খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব রোকেয়া খাতুন (বর্তমানে ওএসডি), ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান ফারুকী (বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের সাবেক উপ-পরিচালক), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বর্তমানে ওএসডি এবং খাদ্য অধিদফতরের সাবেক উপ-পরিচালক-সংস্থাপন) ইফতেখার আহমেদসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয় বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

অপরদিকে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি সেবা সেক্টরে দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনে ১৪টি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিসংক্রান্ত অনুসন্ধানী টিম কাজ করছে। অনুসন্ধানাধীন উল্লেখযোগ্য সেক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, রেল যোগাযোগ, নৌপথ যোগাযোগ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমান, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো, কারা অধিদপ্তরগুলো, আয়কর বিভাগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (ওসিএজি), কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। বিশেষ টিমগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের আট পরিচালক। প্রতিটি টিমে একজন করে উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক সদস্য রয়েছেন। দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত) আসাদুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে এসব টিম কাজ করছে। ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন, সংস্থাপন ও অর্থ) মুনির চৌধুরীও টিমগুলোর তদারকির দায়িত্ব পালন করছেন।

দুদক পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে শিক্ষা সংক্রান্ত অনুসন্ধান টিমের সদস্য এরই মধ্যে তাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এতে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির ধরন, উৎস ও কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষা খাতের প্রশ্নপত্র ফাঁস, নোট বা গাইড, কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি, নিয়োগ ও বদলিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির উৎস বন্ধের জন্য ৩৯টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রধান প্রকৌশলীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে। এছাড়া, তফসিলভুক্ত অপরাধের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares