ওসমানী হাসপাতালে নিরাপদ নন কেউই : বিচারহীনতায় বেপরোয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

প্রকাশিত: ৩:২৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২৬

ওসমানী হাসপাতালে নিরাপদ নন কেউই : বিচারহীনতায় বেপরোয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :: চিকিৎসা নিতে এসে হামলার শিকার হচ্ছেন রোগীর স্বজনেরা। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত সাংবাদিকেরা। কখনো লাঞ্ছিত, কখনো মারধরের শিকার, আবার কখনো জিম্মি করে রাখা। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দৃশ্যমান নজির নেই। উপরন্তু জিম্মি হতে হয়েছে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও। ফলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বারবার ফিরে আসছে একই পরিস্থিতি।

গত দশ বছরে বহু ঘটনার সাক্ষি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এ অঞ্চলের চিকিৎসার আতুড়ঘর খ্যাত হাসপাতালটিতে বিভিন্ন সময় চিকিৎসা নিতে আসা রোগির স্বজনরা হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নাক্কারজনক হামলা থেকে বাদ যাননি সাংবাদিকেরাও। বিভিন্ন সময় সংগঠিত পরিস্থিতির তথ্য নিতে গিয়ে সাংবাদিকরাও আক্রান্ত হয়েছেন। এর পূণরাবৃত্তি ঘটেছে গত ২৮ অক্টোবর। হাসপাতালের রোগির স্বজনদের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মিলে পেটানোর ছবি ও ভিডিওচিত্র ধারণ করতে গিয়ে এমন নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে।

গত ১০ বছরে হাসপাতালে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটলেও কোনো বিচার কিংবা শাস্তি হয়নি। বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। অভিভাবকহীন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এখন ভীত সন্ত্রস্ত সিলেটবাসী। হাসপাতালটিতে এখন প্রতিনিয়ত পেটানো হয় রোগির স্বজনদের। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করলেও প্রতিঘাত স্বরূপ কর্মবিরতির নামে আসে রোগিদের চিকিৎসাহীন রেখে দাবি আদায়ের কর্মসূচি।

সবশেষ ২৮ অক্টোবর রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক আক্রান্ত হন। দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল ও সিলেটভিউ২৪ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার আহত হন। এই ঘটনাকেও পাশ কাটাতে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।

ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিবাদ তৈরি হয়। ৩১ অক্টোবর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন করে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

একই বছরের ১৬ জানুয়ারি হাসপাতালের চতুর্থ তলার সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও ওঠে। পরে রোগীর তিন স্বজনকে পুলিশ আটক করে আদালতে পাঠায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন।

এ বছরের ১৭ জানুয়ারি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও স্টাফদের সঙ্গে রোগীর স্বজনরা তর্কে জড়ান। ফলশ্রুতিতে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেন। ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) দিবাগত রাত ১২টার দিকে হাসপাতালের চতুর্থ তলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে এই হামলার ঘটনা ঘটে। পরে তারা ওয়ার্ডের ভেতরে ভাঙচুরের অভিযোগ আনেন। এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হেনস্তারও অভিযোগ তুলেন। ডাক্তার ও স্টাফরা মিলে রোগীর তিন স্বজনকে বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন। উল্টো শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করে। আটককৃতরা হলেন-সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার খৈতর গ্রামের শিমুল আহমদ (৩৫), একই গ্রামের নাজিরা সিদ্দিকা (২২) ও জাবেদ মিয়া (২৬)।

মফস্বল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগির স্বজনরা সুচিকিৎসার পরিবর্তে বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও পরদিন শনিবার ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি দেয়।

গত ৮ জুলাই হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে কয়েক দফা রোগির স্বজনদের ওপর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উপরন্ত এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনির্দিষ্টকাল কর্মবিরতি ঘোষণা করা হয়। পরে ইন্টার্ন ডক্টরস ফোরাম রোগির স্বজনদের হামলায় জড়িত অভিযোগ অভিযোগ এনে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

গত বছরের ২৭ এপ্রিল সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নং ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনকে লাথি মারেন চিকিৎসক। লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসককে কর্তব্য থেকে বিরত রেখে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় সারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্ত চিকিৎসকের নাম তন্ময় দেবনাথ। তিনি হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, কর্তব্যরত চিকিৎসককে এক রোগীর স্বজনকে কিছু একটা বলছেন। এসময় তেড়ে আসেন চিকিৎসক। এক পর্যায়ে যুবককে লাথি মারতেও দেখা যায়।

জানা গেছে, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসেন জুবায়ের আহমদ নামে এক ব্যক্তি। ঘটনার সময় রোগীর অ্যাপেন্ডিকসের ব্যথা হচ্ছিল। মারধরের শিকার যুবক ওই রোগীর বন্ধু।

২০২৪ সালের ২১ মার্চ এক প্রবীণ রোগীকে চিকিৎসকেরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এক নারী চিকিৎসক হাসপাতাল পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন।

২০২৩ সালের ২১ আগস্ট। হাসপাতালে ৩৫ নং ওয়ার্ডে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন রোগির স্বজনরা। সে সময় রোগির স্বজনদের ওপর হামলা চালিয়েছেন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা। ক্ষুব্ধ রোগির স্বজনরাও ভাঙচুর করেন। পরিপ্রেক্ষিতে রোগির স্বজনদের চারজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ছিল- চিকিৎসা না পেয়ে তাদের রোগী মারা যান। ওইদিন আটক হন আবদুল মালিক (৫৪), সাবেল আহমদ, জুবেল আহমদ ও জুয়েল আহমদ।

২০২২ সালের ৩আগস্ট শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সাথে দুব্যবহারের অভিযোগ এনে কর্মবিরতি দিয়ে বসেন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা। এতে ভোগান্তিতে পড়েন রোগী নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন স্বজনরা। হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও শিক্ষানবিশ নারী চিকিৎসককে হয়রানির অভিযোগ আনেন তারা। এ ঘটনায় প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বয়কট করেন। তাদের দাবি কয়েকজন দুর্বৃত্ত কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করতে রোগিদের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেন তারা। সেদিন হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের দায়ের করা মামলায় আব্দুল্লাহ নামের এক যুবক ও অজ্ঞাতনামা আরও ৩/৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

২০২২ সালের ১২ আগস্ট হাসপাতালে রোগীর স্বজনকে মারধরের অভিযোগ উঠে। হাসপাতালের চার তলার ১ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন রুবেনা বেগম (২৭) নামে এক নারী।

২০২১ সালেও নভেম্বর সিলেটের এক সিনিয়র সাংবাদিক তাঁর শ্বশুড়কে গুরুতর অবস্থায় ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেদিনও চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব করায় উপ পরিচালকের কাছে ফোন করে অভিযোগ করেন ওই সাংবাদিক। ঘটনাটি জানতে পেরে ইন্টার্ণ চিকিৎসরা তাঁর ওপর চড়াও হন। খবর পেয়ে অন্য সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে যান এবং তাকে অবরোদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

২০১৯ সালের ১২ মার্চ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ এনে রোগীর দুই স্বজনকে মারধর করা হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগির স্বজনদের মারতে কর্মরত আনসারদের নির্দেশ দেন। তারা মারধর করে ক্ষান্ত হননি, জনসম্মুখে রোগীর স্বজনদের কান ধরিয়ে ওঠবস করান। আহতরা যাতে অভিযোগ না করেন, এজন্য কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নিয়ে ছেড়ে দেন। হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে এ ঘটনা ঘটেছিল। ওইদিন বেধড়ক মারধরে আহতরা হলেন- সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সওতরপাড়ার কালিপুরের ইসমাইল আলী (৩৫) ও একই এলাকার জ্যোতিন্দ্র বিশ্বাস (২৫)। ওইদিনের ঘটনাটি দেখে হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনেরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে রোগী দেখতে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসা ও হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে রোগীর দুই স্বজন আহত হন।

এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কোথাও অভিযুক্তকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে, কোথাও মামলা হয়েছে, আবার কোনো ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন, বিভাগীয় শাস্তির কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

এছাড়া ১/১১’র সময়ে ২০০৮ সালেও কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ওসমানী হাসপাতালে কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসকের হামলার শিকার হয়েছিলেন। সে সময় সিলেটের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ওই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ঘটনাটি আপসে নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেন। ২০২৬ সালে ওই ঘটনার পূণরাবৃত্তি ঘটে।

ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, তেমনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু একই হাসপাতালে রোহির স্বজনদের ওপর বারবার হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ এবং চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘটনা হাসপাতালের চিকিৎসা সেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

November 2026
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..