সুনামগঞ্জ সওজের ৩৮ কোটি টাকার দুর্নীতি: ভুয়া ইস্টিমেট ও চেক জালিয়াতির অভিযোগ

প্রকাশিত: ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২৬

সুনামগঞ্জ সওজের ৩৮ কোটি টাকার দুর্নীতি: ভুয়া ইস্টিমেট ও চেক জালিয়াতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ: সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগে ভুয়া ইস্টিমেট, জাল চুক্তি এবং চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আগে থেকেই সম্পন্ন হওয়া সড়ক, সেতু ও কালভার্টের কাজ নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে ৮৭ কোটি টাকার বিশাল প্রাক্কলন তৈরি করে এই দুর্নীতির জাল পাতা হয় বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলে রব্বে, সুনামগঞ্জ সওজের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ড. আব্দুল আহাদ এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) আলাউদ্দিন সোহাগের সময়ে সুনামগঞ্জের ৯টি সেতু ও অ্যাপ্রোচ কালভার্টের জন্য প্রায় ৮৭ কোটি টাকার এই প্রাক্কলন তৈরি করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, আনোয়ারপুর-ফতেপুর সড়কের চারটি অ্যাপ্রোচ, আলীপুর ব্রিজ, নিয়ামতপুর রাস্তার ব্রিজ, বিশ্বম্ভরপুর কলেজ রোডের অ্যাপ্রোচ, হরিপুর ব্রিজ এবং রঙ্গিয়ারচর ব্রিজের কাজ ইতিপূর্বেই সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এই সমাপ্ত কাজগুলোকেই নতুন প্রকল্পের তালিকায় ঢুকিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের পথ তৈরি করা হয়। এছাড়া সালামপুর-লালপুরের তিনটি অ্যাপ্রোচ, জলিলপুরের দুটি কালভার্ট এবং কুপা ব্রিজের সংযোগ সড়কও এই প্রাক্কলনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০২৪ সালের ২৭ মার্চ এই প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং কাজ পায় ‘মোঃ বদরুল ইকবাল লিমিটেড’। তবে কাজ পাওয়ার পরই ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বদরুল ইকবালের অনুপস্থিতিতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ব্যবসায়ী মোঃ আজাদ হোসেনকে সাব-ঠিকাদার নিয়োগের চুক্তি করা হয়।

পরবর্তীতে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে বদরুল ইকবাল তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেন। একই প্রকল্পে একজন সাব-ঠিকাদার এবং অন্যজন প্রতিনিধি থাকায় বিষয়টি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়। বিদেশে অবস্থানরত ঠিকাদারের পক্ষে এই প্রতিনিধিত্ব ও চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পের বিল উত্তোলন ও বণ্টনকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দেয়। প্রথম ধাপের ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের পর দ্বিতীয় কিস্তির ১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার বিল তোলা হয়। এরপর অর্থের হিসাব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সাব-ঠিকাদার আজাদ হোসেনকে সিলেটে ডেকে এনে মানসিক চাপে ফেলা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে শফিকুল বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামলা করলে পুলিশ আজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।

ভুক্তভোগী আজাদ হোসেনের দাবি, তাঁকে সাব-ঠিকাদার করার প্রলোভন দেখিয়ে এই পরিকল্পিত লুটপাটের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল এবং পরে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ৮৭ কোটি টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে ইতোমধ্যে ৩৭ কোটি ৯৯ লাখ ৫ হাজার ৬০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অনিয়মের বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় অবশিষ্ট অর্থ উত্তোলন আপাতত আটকে গেছে। তবে বাস্তবে কী পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং উত্তোলিত অর্থের কতটুকু আত্মসাৎ হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের দাবি, সরকারি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত করা হোক। একইসঙ্গে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

November 2026
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..