ওয়াজ রাজনীতি একাকার

প্রকাশিত: ৭:২৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০১৯

ওয়াজ রাজনীতি একাকার

Sharing is caring!

ধর্মীয় প্রচার অনুষ্ঠান হিসেবে ওয়াজ মাহফিল স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশে শুরু থেকেই এর সঙ্গে ‘রাজনীতি’ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সাধারণ পেশাজীবীরা নানান কৌশলে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মূলত চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরই এতে সক্রিয় হন। কওমি মাদ্রাসার আলেমদের ক্ষেত্রে অবশ্য তা ভিন্ন। যিনি কওমি মাদ্রাসার আলেম, তিনিই দলের প্রধান; ওই একই ব্যক্তি আবার মাহফিলের বক্তা।

একদিকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো ‘প্রচারণা’র অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে ওয়াজকে, অন্যদিকে গত একযুগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের লোকেরা মাহফিলমুখী হয়েছেন। প্রায় প্রতিটি মাহফিলেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রধান ও বিশেষ অতিথির আসন অলঙ্কৃত করছেন। আলেমদের মন্তব্য, ‘ধর্মীয় সভায় ক্ষমতাসীন বা রাজনীতিকদের উপস্থিতি সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’

ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, ‘রাজনীতিক ও প্রশাসনের লোকেরা এসে মাহফিলে বসেন, ওয়াজ শোনেন, এটা একদিক থেকে ভালো। একসময় পত্রিকায় ইসলামি পাতা ছিল না। গত ১২-১৩ বছর ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে তা বের হচ্ছে। এগুলোতে আলেমরা লিখছেন। এভাবে রাজনীতিকরাও মাহফিলে এসে টুপি মাথায় দিয়ে বসছেন, এটা ভালো দিক। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—মাদ্রাসায় যেমন আগে শুধু দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়ে বা আলেম পরিবারের সন্তানেরাই ভর্তি হতো, এখন কিন্তু সেই চিত্র পাল্টেছে। ধনীদের সন্তানেরাও মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আলেমরা দুই ভাগে বিভক্ত হন। ভারতের দেওবন্দি আদর্শের আলেমরা দেশভাগের বিপক্ষে আর অন্য আলেমরা পাকিস্তান সৃষ্টিকে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এর প্রভাব পড়েছে ওয়াজে। পূর্বসূরিদের সেই রাজনৈতিক অবস্থান ছায়া ফেলেছে মাহফিলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, ‘ওয়াজের প্রবণতা ১৯৭১ সালের আগেও ছিল। এরপর বিশেষ করে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাহফিলের প্রসার ঘটতে থাকে।’

মাহফিলের বাইরে পীর-মাশায়েখ বা মাজার-খানকার আচরণেও কখনও কখনও রাজনীতির প্রভাব পড়েছে। বাংলা সাহিত্যেও এই মাজার-খানকার সঙ্গে রাজনৈতিক অভিসন্ধির বর্ণনা পাওয়া গেছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে পাহাড় ছেড়ে সমতলের মহব্বতনগর গ্রামে এসেছিল ‘লালসালু’র মজিদ। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত এই উপন্যাসের পটভূমি চল্লিশের দশক। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি উঠে এসেছে এতে। দেশভাগ থেকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ— সময়ের প্রবহমানতায় পরিবর্তিত হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে এসে ‘মজিদ’দের অবয়ব ও পরিচয় পাল্টেছে। এখন মাজার-খানকার দায়িত্বশীলরা সরাসরি রাজনৈতিক দলে যুক্ত আছেন।

ইসলামি দলগুলোর লোগোবাংলাদেশে প্রায় সব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী মাহফিলের বক্তা। এরমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে ওয়াজের সম্পর্ক বেশি। এগুলোর নেতাকর্মী ও ভক্ত-সমর্থক তৈরির পেছনে দলীয় অনুসারী বক্তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ দুই নেতা প্রায় প্রতিদিনই মাহফিলে অংশ নেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওয়াজ করে জনপ্রিয়তা পেয়ে দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতৃত্বে বসেছিলেন।

বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দল ও আলেমদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উল্লেখযোগ্য বক্তাদের মধ্যে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মামুনুল হক, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মাওলানা সাজিদুর রহমান ও মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, ইসলামী আন্দোলনের আমির মাওলানা সৈয়দ রেজাউল করিম ও নায়েবে আমির মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল করিম, খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা জোবায়ের আহমদ আনসারী, জমিয়তুল উলামার মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, জমিয়তের মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী উল্লেখযোগ্য। এছাড়া মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকী, মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিরাজী (নওমুসলিম) ও মাওলানা আব্দুল্লাহ আস সাবেরী ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত বক্তা হিসেবে পরিচিত।

(বাঁ থেকে) মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী, মাওলানা সৈয়দ রেজাউল করিম ও মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকীমুজাহিদ কমিটির মাহফিলের প্রভাব দলের নেতাকর্মী ও সমর্থক তৈরিতে কেমন ভূমিকা রাখে? এর উত্তরে ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমাদের আমির ও নায়েবে আমির লাগাতার মাহফিল করেন। মানুষ যেন দ্বীনের পথে আসে সেই আত্মশুদ্ধির জন্যই মুজাহিদ কমিটির কার্যক্রম। এখানে কোনও রাজনীতি নেই। যারা মুজাহিদ কমিটিতে এসে পরিবর্তন হয়, তাদের অনেকে আমাদের সংগঠনের সমর্থক হিসেবে কাজ করে।’

জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—জামায়াতপন্থী বক্তাদের মধ্যে আছেন মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী, মাওলানা তারেক মনোয়ার, মাওলানা আবদুল্লাহ আল মামুন, মাওলানা আমীর হামজা, মাওলানা মিজানুর রহমান আযহারী, মাওলানা মোল্লা নাজিম প্রমুখ। জামায়াতপন্থী বক্তাদের প্রায় সব ওয়াজেই জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রসঙ্গ উঠে আসে। তাদের মাহফিলগুলোতে জামায়াতের রাজনৈতিক স্লোগান ‘আল কোরানের আলো, ঘরে-ঘরে জ্বালো’ বলে ময়দান কাঁপিয়ে তোলেন শ্রোতারা। একইভাবে বক্তাদের মুখে মুখে নিয়মিত বিবৃত হয় সাঈদী প্রসঙ্গ। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে সাজা খাটছেন তিনি।

(ওপরে বাঁ থেকে) মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী, মাওলানা আবদুল্লাহ আল মামুন ও মাওলানা মোল্লা নাজিম (নিচে বাঁ থেকে) মাওলানা তারেক মনোয়ার, মাওলানা আমীর হামজা ও মাওলানা মিজানুর রহমান আযহারীওয়াজে সাঈদীর প্রসঙ্গ উত্থাপনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তুরিন আফরোজ মনে করেন, এক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তার কথায়, ‘ওয়াজে যা বলা হচ্ছে তাতে অপরাধ দর্শনের মৌলবাদকে উসকে দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ঘরানার বক্তাদের মাধ্যমে মূলত দলের অপরাধ দর্শনকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, একাত্তরের ঘৃণ্য ভূমিকার কারণে দলটির নেতাদের বিচার হয়েছে।’

ফেনী জেলা জামায়াতের আমির একেএম শামসুদ্দিন মনে করেন, মাহফিলে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রভাব পড়েছে অনেক, কারণ তিনি জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল পর্যায়ে ছিলেন। তবে তার দাবি, ‘যারা ওয়াজ করছেন, তারা সাংগঠনিকভাবে আমাদের সঙ্গে নেই।’

নেতাকর্মীরা বলছেন, গত জানুয়ারির মাঝামাঝি দলীয়ভাবে ‘রাজনৈতিক’ কর্মকাণ্ডের ধারাকে স্থগিত করে জামায়াত। এক্ষেত্রে সামাজিক কাজকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। দলটি মনে করেন, ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের যেমন চাঙ্গা রাখা যায়, তেমনি ধর্মীয় বলয়ে নিজেদের ঘরানার শ্রোতামণ্ডলী তৈরি হয়।

মাজার-খানকাপন্থীদের মধ্যেও অনেকে রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে তারা ওয়াজ মাহফিলের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেও মাজারকেন্দ্রিক ওরস আয়োজন করে থাকেন। কোনও কোনও পীর আবার রাজনীতিমুক্ত। মাজারভিত্তিক পীর হিসেবে চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের দুই প্রতিনিধির দুটি দল রয়েছে। সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সৈয়দ সাইফুদ্দিন আল হাসানী ও তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক মিরপুরে একটি খানকার দায়িত্বে আছেন। বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের জাকের পার্টিসহ দেওয়ানবাগ শরীফ, আটরশি দরবারসহ কয়েকটি দরবার আছে, যেগুলোর সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দল নেই।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘প্রথমত আমরা সুফিবাদকে ধারণ ও বহন করি। বাংলাদেশের সংবিধানের ওপর সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে চলি। আমাদের রাজনৈতিক দল তরিকত ফেডারেশন সব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কাজ করে। মাজার-খানকাভিত্তিক হলেও সব ধর্মের মানুষকে নিয়েই আমাদের কাজ। আমরা কখনও রাজনীতির জন্য ওয়াজ মাহফিলকে পুঁজি করি না।’

সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী মনে করেন, দেশের যেকোনও নাগরিক মাহফিল ও রাজনীতি করতে পারেন। তার ভাষ্য, ‘যার-যার ধর্ম তার তার। আমরা বলি মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়।’ সূত্র- বাংলা ট্রিবিউন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares