আওয়ামী লীগ নেতাকে ম্যানেজ করে খেলার মাঠে বাণিজ্য মেলা

প্রকাশিত: ১:১৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০১৮

Sharing is caring!

সৈয়দ বাপ্পী : সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির ব্যানারে সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০১৭ আয়োজন করা হয়েছে নগরীর শাহী ঈদগাহ শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামে। সিলেটে একটি চক্র প্রতিবারই মেলা আয়োজন করে। তারা যখন যে সরকার থাকে তখন তাদের লোক হয়ে মেলার আয়োজন করে। এবার তারা ২ কোটি টাকার বিনিময়ে সরকারের খাস জমিতে সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০১৭ আয়োজন করেছে। এই চক্রের মূল হোতা সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাস্ট্রির সদস্য এবং মেলার সমন্বয়কারী এমএমঈন খান বাবলু। যিনি সিলেটে মেলা বাবলু নামে সিলেটে পরিচিত। আর এই মেলার মাঠ নিজেদের দাবী করে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ তাদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এই সদর উপজেলা মাঠ নামে খোলা জায়গায় বিভিন্ন এলাকার এবং স্থানীয় শিশু-কিশোর খেলাধুলা করতো। এই মাঠ নিয়ে একটি মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব সৈয়দ আমিনুর রহমান।

এদিকে রিট প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক শহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা এটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন। বাণিজ্য মেলা বিষয়ে আমাদের কোনো অনুমোতি নেই, আমাদের কোনো নিষেধও নেই। তবে এই রিটের ভিত্তিতে আমরা সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সদর উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সিলেট পুলিশ কমিশনারকে বলে দিয়েছি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য।

এদিকে এই খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের প্রতিবাদ জানিয়ে বৃহত্তর শাহী ঈদগাহ এলাকাবাসী নামের একটি সংগঠন মাঠ রক্ষায় দীর্ঘদিন থেকে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আদালত মাঠটিকে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ হিসেবে রাখার জন্যও নির্দেশনা প্রদান করেন। আর এই রিট আবেদনটি করেন নগরীর শাহী ঈদগাহর বাসিন্দা নাজির আহমেদ চৌধুরীর ছেলে মনজু জামান চৌধুরী। গত ১৪ ডিসেম্বর তিনি একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। কিন্তু আইনের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতিতে রিটের কোনো জবাব ছাড়াই প্রশাসন এবং সিলেট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ম্যানেজ করে তারা অবলিলায় মেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, সিলেটের জেলা প্রশাসক, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আয়োজকরা দাবী করছেন, তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের অনুমতি নিয়েই মেলা করেছেন। আইন অনুযায়ী খেলার মাঠে খেলা ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার কিংবা ভাড়া দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এই আইন লঙ্ঘন করেই খেলার মাঠ (বর্তমানে নির্মাণাধীন শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম) মেলা জন্য ভাড়া দিয়েছেন সদর উপজেলা প্রশাসন।
অভিযোগ আছে, সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ২ লাখ টাকার বিনিময়ে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ-১ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগের পাশাপাশি তারা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ লাগিয়েছেন। যে কারনে এলাকায় লোড শেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোন কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী রতন কুমার বিশ্বাস।

এলাকাবাসীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মেলায় পর্যাপ্ত গাড়ি র্পাকিং না থাকার কারণে সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত রাস্তায় যানজট লেগেই থাকে। মেলার পাশেই রয়েছে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল। মেলার যানজটের কারণে যানবাহনের হর্ন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হাসপাতালের রোগীদেরও ব্যাঘাত ঘটছে। তাছাড়াও প্রতিদিন মেলায় আগত মেয়ে এবং মহিলা দর্শণার্থীদের ইভটিজিং করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, খেলার মাঠ অন্য কোনোভাবে ব্যবহার বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। এই আইন লঙ্ঘনে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় সাজার বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আইন উপদেষ্ঠা ও সাবেক ভিপি-জিপি জজকোর্ট এবং সিলেট জজ কোর্টের এ্যাডভোকেট এএইচ ইরশাদুল হক কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রুল জারী করা হয় তবে তাদের উচিৎ হাইকোর্টকে সম্মান জানানো এটা স্থগিতাদেশের সমতুল্য। হাইকোর্টের রুল জারী মানেই শোকজ। যদি কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই রুল জারী করা হয় তবে তাদের উচিৎ হবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে সুরাহা করার পর তাদের কার্যক্রম শুরু করা।

কত টাকার বিনিময়ে এই খেলার মাঠ ইজারা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি হাসিন আহমদ ও মেলার সমন্বয়কারী এমএমঈন খান বাবলু তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি নিয়ে এই মেলা করছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতও চান সিলেটে একটি মেলা হোক। এই মাঠ বাবৎ যা টাকা আমরা পেয়েছি তা চেক মাধ্যমে। আমরা মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি। টাকার বিষয়ে তাদের জিজ্ঞেস করেন আমি বলতে পারবো না। এই মাঠে রিট করে রুল জারী করেছে হাইকোর্ট এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিটতো অনেকেই করেন, যিনি রিট করেছেন মেলা শুরুর কদিন আগে তিনি আমার কাছে এসেছিলেন এই মাঠ সিলেট চেম্বার অব কমার্সের জন্য ভাড়া নেবার জন্য।

এই মাঠ সদর উপজেলার মাঠ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মাঠ ডিসি খতিয়ানের, সদর উপজেলার মাঠ বলেই চলছে। দীর্ঘদিন থেকেই এই মাঠ নিয়ে একটি মামলা চলছে, আর এই মামলা পরিচালনা করছে সদর উপজেলা অফিস। এই খেলার মাঠ সদর উপজেলা মাঠ জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে কোন লিখিত দেননি। সর্বশেষ আশফাক আহমদ বলেন, আমার বক্তব্যে যেনো দাঁড়ি, কমা ঠিক থাকে।

রিট আবেদনকারী শাহী ঈদগাহর বাসিন্দা মনজু জামান চৌধুরী জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা আইনে প্রতি অসম্মান জানিয়ে জবাব না দিয়ে তারা মেলা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি হাসিন আহমদ ও মেলার সমন্বয়কারী এমএমঈন খান বাবলু হাইকোর্টের কাগজ জালিয়াতী করে ২ সপ্তাহের জায়গায় ৪ সপ্তাহ বানিয়েছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসিন আহমদ জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের অনুমতি নিয়েই আমরা এই মেলা করছি। মেলা বাবৎ সদর উপজেলা অফিসকে ৫ লাখ টাকা আর একটি মাদ্রাসায় ২ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। তবে কোন মাদ্রাসায় দেয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না। গত ১৪ ডিসেম্বর একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। তিনি সে বিষয়েও অবগত নন।

সিলেট পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম কিবরিয়া জানান, সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আমাদের কাছে মেলা কর্তৃপক্ষ একটি আবেদন করেছেন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য আমরা সেখানে পুলিশ রেখেছি।
সিলেট সদর উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিরাজাম মুনিরা জানান, নগরীর শাহী ঈদগাহ শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম এই খেলার মাঠ সদর উপজেলা পরিষদের জমি না। এটা উপজেলা পরিষদ ভাড়া দিবে কিভাবে? এটা সরকারের খাস জমি। সূত্র – দৈনিক সবুজ সিলেট

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares