সাংবাদিক তোরাব হত্যাকাণ্ড: সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট, সকলেই পলাতক

প্রকাশিত: ১১:০৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০২৬

সাংবাদিক তোরাব হত্যাকাণ্ড: সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট, সকলেই পলাতক

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের রাজপথে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক আবু তাহের মোঃ তোরাবকে গুলি করে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতা সহ মোট ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দাখিল করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় বছর পর দাখিলকৃত এই অভিযোগপত্রটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর শাওন মাহমুদ অপু সিলেটের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই চার্জশীট জমা দেন। আদালত গত ১০ মার্চ, ২০২৬ তারিখে এই চার্জশীট গ্রহণ করে এবং অভিযুক্ত সকল আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনপূর্বক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (W/A) জারি করে। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ০৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

মামলার নথি এবং চার্জশীট অনুসারে, গত ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে দেশব্যাপী চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংবাদ সংগ্রহের সময় দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার তোরাবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ‘নির্দেশ ও উস্কানিতে” এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের “প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়” আসামিরা মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বিক তদন্ত, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, জব্দকৃত আলামত এবং মামলার বাদীসহ মোট ১৩ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩ (বেআইনী সমাবেশ), ১৪৭ (দাঙ্গাহাঙ্গামা), ১৪৮ (মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দাঙ্গা), ৩০২ (হত্যা), ১৪৯ (সাধারণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অপরাধ) এবং ৩৪ (সাধারণ অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক কাজ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারাটি হত্যার অভিযোগ, যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

এই মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের নাম থাকায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযুক্ত ১৮ জন আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ সাদেক দস্তগীর কাউছার, অতিরিক্ত পুলিশ

কমিশনার আজবাহার আলী শেখ, সহকারী পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, কোতয়ালী মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন, ওসি (তদন্ত) ফজলুর রহমান এবং এসআই কাজী রিপন সরকার। পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অভিযুক্তদের মধ্যে আরও রয়েছেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও কাউন্সিলর আপ্তাব উদ্দিন, সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পীযুষ কান্তি দে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পিএস সাজলু লস্কর, ছাত্রলীগ নেতা ও কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সজল দাস অনিক, শিবলু আহমেদ ওরফে মোঃ রুহুল আমিন, পুলিশ সদস্য সেলিম মিয়া, আজহার ও উজ্জল এবং সাবেক মহিলা যুবলীগ নেত্রী মোসাঃ নার্গিস আক্তার রত্না।

একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং একাধিক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে একটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার ঘটনা নজিরবিহীন এবং এটি জাতীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে, অভিযুক্ত সকল আসামি পলাতক থাকায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করতে না পারলে এই বহুল আলোচিত মামলার বিচার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনাটি দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

March 2026
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..