সিলেট | |
প্রকাশিত: ২:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬
আনোয়ার হোসেন রনি :: কিছু মানুষ চলে যান-কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়া শেষ হয়ে যায় না। বরং সময় যত গড়ায়, তাঁদের অনুপস্থিতিই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁরা তখন আর কেবল একজন ব্যক্তি থাকেন না; হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি মূল্যবোধের প্রতীক, একটি প্রজন্মের স্মৃতি।
হারিছ মোহাম্মদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেই দিনটি অনেক দূরে সরে গেছে। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে সংবাদপত্রের চরিত্র, বদলে গেছে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি।
কিন্তু হারিছ মোহাম্মোদের নাম মুছে যায়নি।
কারণ তিনি শুধু সংবাদ লিখতেন না-সংবাদের ভেতরের সত্য খুঁজতেন। শুধু সাংবাদিকতার চাকরি করতেন না-সাংবাদিকতাকে দায়িত্ব মনে করতেন। আর শুধু সিলেটে থাকতেন না-সিলেটকে ভালোবেসে এই শহরকেই নিজের করে নিয়েছিলেন।
নব্বইয়ের দশক : পরিচয়ের সেই শুরু
নব্বইয়ের দশকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তখন তিনি ঢাকা ও সিলেটের বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন। সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল আজকের মতো সহজ নয়। হাতে মোবাইল ফোন নেই, মুহূর্তে সংবাদ পাঠানোর প্রযুক্তি নেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেই। সংবাদ সংগ্রহ মানেই মাঠে ছুটে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তথ্য খোঁজা, নোট নেওয়া এবং দীর্ঘ পরিশ্রমের পর সংবাদ তৈরি করা।
এই কঠিন সময়ের সাংবাদিক ছিলেন হারিছ মোহাম্মদ।
সত্য জানার আগ্রহ তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল। কোনো ঘটনা চোখে যা দেখা যায়, তার মধ্যেই তিনি থেমে থাকতেন না। ঘটনার পেছনের ঘটনা খুঁজতেন। কে লাভবান হচ্ছে, কার ক্ষতি হচ্ছে, কেন ঘটনা ঘটল-এসব প্রশ্ন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত।
তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো তাই কেবল সংবাদ ছিল না; ছিল অনুসন্ধানের ফল। সিলেট তাঁর শিকড় না হলেও হয়ে উঠেছিল আপন হারিছ মোহাম্মোদের জন্মশিকড় সিলেটে ছিল না। কিন্তু মানুষকে ভালোবাসার জন্য শিকড়ের প্রয়োজন হয় না।
সিলেটের মানুষ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি তাঁর ছিল গভীর টান। একসময় এই শহরই হয়ে ওঠে তাঁর আপন ঠিকানা।
সিলেটকে ভালোবেসেই তিনি বিয়ে করেছিলেন শহরের পশ্চিম শহরতলীর বিশিষ্ট ব্যক্তি রাজা চৌধুরীর মেয়েকে।
তাঁর বিয়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ব্যক্তিগত অধ্যায়ও। তাঁর বিয়েতে পাশে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। বারুতখানার ঐতিহ্যবাহী সুরমা বোর্ডিংয়ে অনুষ্ঠিত সেই আকদের প্রস্তুতির দিনগুলোর স্মৃতি আজও চোখের সামনে ভাসে।
তখন কে জানত, সেই হাসিমুখের মানুষটির সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো একদিন স্মৃতির পাতায় ফিরে ফিরে আসবে?
সাংবাদিকতা : পেশার চেয়ে বেশি কিছু হারিছ মোহাম্মোদের জীবনে সাংবাদিকতা ছিল কেবল উপার্জনের পথ নয়। ছিল আত্মপরিচয়ের অংশ।
সাংবাদিকতার সামান্য আয়েই ভাড়াটিয়া বাসায় চলত তাঁর সংসার। সীমিত আয়, পারিবারিক দায়িত্ব ও নানা বাস্তব সংকট—সবকিছুর মধ্যেও পেশার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতায় কোনো ঘাটতি ছিল না।
তিনি দৈনিক দিনকালের সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দৈনিক সিলেট বাণীতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবাদিকতার সংগঠন সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
কিন্তু পদ-পদবি দিয়ে হারিছ মোহাম্মোদকে চেনা যাবে না।
তাঁকে চিনতে হলে তাঁর সাংবাদিকতা বুঝতে হবে। তিনি ছিলেন সৎ, স্পষ্টবাদী ও নির্ভীক। সত্যকে সত্য বলার ক্ষেত্রে আপস করতে চাইতেন না। তাঁর প্রতিবেদনে তথ্যের পাশাপাশি থাকত অনুসন্ধানের ছাপ। একটি ভালো সংবাদ শুধু পাঠককে জানায় না—পাঠককে ভাবায়। হারিছ মোহাম্মোদের অনেক প্রতিবেদন সেই কাজটিই করত।
চায়ের কাপেই জমত সংবাদ-রাজনীতির আড্ডা
কর্মজীবনের ব্যস্ততায় সময়ের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু দেখা হলেই দূরত্ব যেন মুহূর্তে মিলিয়ে যেত।
তারপর শুরু হতো চায়ের আড্ডা। চায়ের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ দুর্বলতা। আর চায়ের সঙ্গে থাকত তাঁর প্রিয় চুরুট।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দেশ-রাজনীতি, সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা কিংবা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ শুনতে শুনতে সময় কখন যে চলে যেত, বোঝাই যেত না।
চুরুটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যেত। কিন্তু তাঁর বলা কথাগুলো থেকে যেত মনে। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। কোনো বিষয়ে একমত না হলে সরাসরি বলতেন। তর্ক করতেন, যুক্তি দিতেন, আবার আড্ডার শেষে আগের মতোই আন্তরিক থাকতেন। মানুষ হিসেবে এটাই ছিল তাঁর বড় বৈশিষ্ট্য—মতভেদকে সম্পর্কের শত্রু হতে দিতেন না।
নিজের অসুখের খবরও যেন সংবাদ হয়ে উঠতে দেননি
সাংবাদিকরা অন্যের খবর খোঁজেন। কিন্তু নিজের জীবনের খবর অনেক সময় আড়ালেই রাখেন।
হারিছ মোহাম্মোদও ছিলেন তেমন। নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই চেপে রাখতেন। বক্ষব্যাধিতে তিনি কতটা ভুগছিলেন, তা হয়তো অনেকেই জানতেন না। অসুস্থতার গভীরতা তিনি সহজে প্রকাশ করতেন না।
হয়তো সাংবাদিক জীবনের অভ্যাসই তাঁকে এমন করে তুলেছিল—অন্যের কথা বলবেন, নিজের কথা নয়।
কিন্তু শরীরের কাছে শেষ পর্যন্ত তাঁকে হার মানতেই হলো।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল তিনি চলে গেলেন অনন্তের পথে।
একটি পরিবার হারাল তার অভিভাবককে।
স্ত্রী হারালেন জীবনসঙ্গীকে। তিন মেয়ে ও এক ছেলে হারাল তাদের বাবাকে। আর সিলেটের সাংবাদিকতা হারাল একজন নির্ভীক কণ্ঠকে। মৃত্যু থামাতে পারেনি তাঁর সাংবাদিকতাকে একজন সাংবাদিকের মৃত্যুতে তাঁর কলম থেমে যায়। কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর আদর্শ, তাঁর পেশাগত সততা থেমে যায় না। হারিছ মোহাম্মোদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আজকের সাংবাদিকতা অনেক দ্রুত। একটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তা মোবাইলের পর্দায় চলে আসে সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে। প্রযুক্তি সাংবাদিকতাকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো একই রয়ে গেছে
সংবাদ কি সত্য? আরেকটি প্রশ্ন—সাংবাদিক কি সত্য অনুসন্ধানের সাহস রাখেন?এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়ালে হারিছ মোহাম্মোদের মতো সাংবাদিকদের কথা মনে পড়ে। কারণ তিনি এমন এক সময়ে সাংবাদিকতা করেছেন, যখন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি সেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন তাঁর কাজ দিয়ে।
কেন এখনো মনে পড়ে হারিছকে? কারণ মানুষ তাঁর পদবি মনে রাখে না, মানুষ মনে রাখে মানুষটিকে।
হারিছ মোহাম্মোদকে মনে পড়ে তাঁর হাসির জন্য।
মনে পড়ে চায়ের কাপের জন্য। মনে পড়ে চুরুটের ধোঁয়ার জন্য। মনে পড়ে তাঁর সরাসরি কথার জন্য। মনে পড়ে তাঁর সংবাদ অনুসন্ধানের জন্য।
আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তাঁর সততার জন্য।
সময় তাঁকে আমাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতি তাঁকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে। কখনো কোনো পুরোনো সংবাদপত্রের পাতা হাতে এলে মনে হয়—হারিছ যদি আজ থাকতেন, এই খবরটিকে কীভাবে দেখতেন?
কোন প্রশ্নটি তুলতেন? কোন তথ্যটি খুঁজতেন?
কাকে ফোন করতেন? কোথায় যেতেন? কী লিখতেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশ্নগুলোই প্রমাণ করে—তিনি এখনো স্মৃতিতে সক্রিয়।
একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় সাংবাদিকের পরিচয় শুধু কোনো সংবাদপত্রের পদবিতে নয়। তাঁর পরিচয় তাঁর কাজের মধ্যে।
হারিছ মোহাম্মোদ সেই অর্থে ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ সাংবাদিক। তিনি জানতেন, সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম কখনো কখনো ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। সেই কলম মানুষের কথা বলতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে, অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যকে সামনে আনতে পারে। তাঁর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সততা।
তিনি হয়তো বড় কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। রেখে যাননি অট্টালিকা কিংবা বিপুল অর্থ। কিন্তু রেখে গেছেন একটি বড় সম্পদ—একজন সৎ সাংবাদিকের স্মৃতি। স্মৃতির মণিকোঠায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
মানুষ চলে যায়। সময় চলে যায়। শহর বদলে যায়। সংবাদপত্র বদলে যায়। প্রজন্ম বদলে যায়।
তবু কিছু মুখ থেকে যায়।
হারিছ মোহাম্মোদ সেই মুখগুলোর একজন। সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসের একটি সময়ে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উপস্থিতি। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে মনে রাখবেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে। বন্ধুরা মনে রাখবেন চায়ের আড্ডার সঙ্গী হিসেবে। পরিবার তাঁকে মনে রাখবে আপনজন হিসেবে। আর তাঁর পরিচিতজনেরা মনে রাখবেন হাসিমুখের সেই স্পষ্টবাদী মানুষটিকে। ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল তাঁর জীবনের সংবাদটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হয়নি। কারণ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের গল্প কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না।
হারিছ মোহাম্মোদ আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সাংবাদিকতার সততা, তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন, তাঁর স্পষ্ট কথন এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এখনো স্মৃতির পাতায় অমলিন।
তিনি ছিলেন সময়ের একজন সাংবাদিক। তিনি ছিলেন সত্যের একজন অনুসন্ধানী। তিনি ছিলেন সিলেটের একজন আপন মানুষ। আর আজ—তিনি স্মৃতির মণিকোঠায় জ্বলতে থাকা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
জীবনের এই চিরচেনা পথে একদিন আমাদেরও চলে যেতে হবে। হারিছ চলে গেছেন তাঁর নির্ধারিত গন্তব্যে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি আমাদের থামিয়ে দেয়, ভাবায় এবং মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের জীবন শেষ হতে পারে, কিন্তু তাঁর সততা ও কর্মের আলো কখনো শেষ হয় না।
পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা—সাংবাদিকতার এই উজ্জ্বল নক্ষত্র হারিছ মোহাম্মোদের বিদেহী আত্মাকে চিরশান্তি দান করুন। স্মরণে, শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়—হারিছ মোহাম্মোদ। স্মৃতির মণিকোঠায় আপনি আজও আলোকিত!
লেখক: সাংবাদিক ও কবি
আনোয়ার হোসেন রনি।
Sharing is caring!

| S | S | M | T | W | T | F |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | |||
| 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 |
| 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 |
| 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 |
| 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | ||

………………………..

Design and developed by best-bd