“সিসিক নির্বাচন” কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি প্রার্থীরা

প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৫, ২০১৮

Sharing is caring!

নুরুল হক শিপু :: আগামী সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন মেয়র প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থী জয়লাভ করতে হলে তাঁদের শেষ ভরসা হতে পারে ইসলামী দলগুলোর ভোটব্যাংক। আর সংসদের বিরোধীদল জাতীয় পার্টি অতীতে প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এবার দলটিতে মেয়র পদে প্রার্থী দেওয়ার মতো হেভিওয়েট কোনো প্রার্থী নেই বললেই চলে। অবশ্য জামায়াত ইতোমধ্যে দলীয় প্রার্থী ঠিক করেছে। তবে ওই প্রার্থী জামায়াতের প্রতীক নিয়ে নয়; স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর দুই জোটের বাইরের বাম রাজনৈতিক দলগুলো এবার প্রার্থী দেবে বলেও শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন। দলীয় সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এবার মনোনয়ন চাইবেন। এ নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে চলতে স্নায়ু যুদ্ধ। দ্বিধা বিভক্ত আওয়ামী লীগের সকল ভোট নৌকার বাক্সে পড়বে কি-না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। এদিকে ক্ষমতার বাইরে থাকা বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি থেকে পাঁচজন প্রার্থী মেয়র পদে নির্বাচনে প্রদিদ্বন্দ্বীতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ কারণে ভোটের বাক্সেও ধানের শীষের ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা রয়েছে। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধিন ১৮ দলীয় জোটে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাম রাজনৈতিক দল জাসদ এবং বাসদে ভাঙনের পর অন্য বামদলগুলো এক ও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ইসলামী দলগুলোর একাংশের নেতৃবৃন্দ বলছেন, জামায়াতের সাথে আকীদাগত অমিলের কারণে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন না। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরা কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন এবং শেষ পর্যন্ত ইসলামী দলগুলোর ভোটই এ নির্বাচনের ট্রার্মকার্ড হতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এদিকে, জামায়াত একক প্রার্থী ও ইসলামীকদলগুলোর ভোট ভাগাভাগির কারণে বেকায়দায় পড়তে পারেন বিএনপির প্রার্থী। অতীতে জামায়াতের ভোট আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাক্সে জমা হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজে অতীতে জামায়াতের ভোট টানতে পেরেছিলেন এবং বিগত নির্বাচনে বিএনপি তাদের অন্যতম শরিক দল জামায়াতের সমর্থন নিয়ে দলীয় মেয়র প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পেড়েছিল। সেক্ষেত্রে শুধু জামায়াত নয়; বিএনপির এ বিজয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো। তবে এবার হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলো কোন দলকে সমর্থন করবে- তা এখনো নিশ্চিত নয়। ইসলামী দলের একাধিক নেতা বলেছেন, ‘সময় হলে সব জানাবেন এবং তাঁরা চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন মনে করেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ কাজ করে বেশি। অতীতেও যারা মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, তারা যে, শুধু নিজ দলের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন এমন নয়; স্থানীয় নির্বাচনে ভোটারদের দলের বাইরে সৎ এবং যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। তাই জণগন মনে করেন, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া করা যায় কী না তাও নির্বাচন কমিশনকে ভেবে দেখা প্রয়োজন।’ জামায়াতে ইসলামী সূত্র জানায়, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থীতা করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও মহানগর জামায়াতের আমীর অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। একই সাথে তিনি দলীয় ফোরাম ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী পরিষদের সাথে বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। তবে জুবায়েরকেও ইসলামী অন্য কোনো দলের সাথে মতবিনিময় করতে শোনা যায়নি। জুবায়ের নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে প্রচারণায় ব্যস্ত দলীয় নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে; আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করে স্বতন্ত্র অবস্থান থেকেই প্রার্থী দেবে। এ কারণে দলের গ্রীণ সিগন্যাল পেয়েই সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মহানগর জামায়াতের আমির জুবায়ের জোরেশোরে কার্যক্রম শুরু করেছেন। তবে, বিএনপির তরফ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসলেও ব্যক্তিগতভাবে জামায়াতের সাথে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপি থেকে মেয়র পদ প্রত্যাশী বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সম্প্রতি তিনি মহানগর জামায়াতের অফিসেও ঘুরে এসেছেন। আর সিলেট জামায়াতের নেতারা বলছেন, গত সিটি নির্বাচনে তাঁরা বিএনপিকে ছাড় দিয়েছিলেন। অতীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামরানও জামায়াতের ভোট পেয়েছেন-তবে, এবার তাঁরা কোনো দলকেই ছাড় দিতে নারাজ। সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, কোনো দলের ব্যাপারে আমার মতামত নেই। এটি বলতে পারি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নগরবাসী ভরসা রাখবেন। কারণ এই নগরের উন্নয়ন যা হয়েছে তার সিংহভাগই আওয়ামী লীগ সরকার করেছে।’ মহানগর জামায়াতের আমীর অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমার দল থেকে আমাকে গ্রীণ সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের সুযোগ না থাকলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবো। তিনি বলেন, মেয়র পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব যে, তা অনেকটাই নিশ্চিত। সবাই সহযোগীতা করলে আগামী দিন সুন্দর একটি সিটি উপহার দিতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘অতীতে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমরা যে, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান কিংবা আরিফুল হক চৌধুরীকে সমর্থন করেছি-এমন নয়; আমারা যাকে যোগ্য প্রার্থী মনে করেছি, তাঁকেই ভোট দিয়েছে। আমারা সবসময় লক্ষ্য করেছি, কার ধারা নগরীর উন্নয়ন হবে।’ জামায়াতের প্রার্থী ব্যাপারে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘১৯৭৮ সালে পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিএনপি বৃহত্তম দল হিসেবে এককভাবে নির্বাচন করে বিজয়ীও হয়েছে। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেই হিসেবে এখন সাময়িকভাবে জোটের শরিক প্রার্থী থাকলেও শেষ সময়ে জোটের সিদ্ধান্তে একক প্রার্থীই মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করবে বলে আমার বিশ্বাস।’ সিলেট জেলা বাসদের সমন্বয়ক আবু জাফর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপি এ দুই দলের নীতি ও আদর্শগত তেমন কোনো অমিল নেই। এখন সময় হয়েছে জণগন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আমরা যারা এই দুই দলের বাইরে আছি, বিশেষ করে বাম দলগুলো এক ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবশ্যই একজন মেয়র প্রার্থী দেব। তিনি বলেন, নির্বাচনকে আমরা মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখি না, আন্দোলনের অংশ হিসেবেই দেখি।’ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কমরেড সিকন্দর আলী বলেন, ‘১৪ দলের একটি শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি। তবে এখনো মেয়র প্রার্থী বা আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে ১৪ দলের আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি। যার কারণে এখনি বলা যাচ্ছে না, ১৪ দলের সাথে আমরা সিটি নির্বাচন করব, কি-না নিজেদের প্রার্থী দেব।’ বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামীয়ার কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মুহিবুর রহমান বলেন, ‘আকাশে চাঁদ ওঠলে সবাই দেখবেন। মেয়র নির্বাচনে আমরা কাকে সমর্থন করব তা সময়ই বলে দেবে। তবে কোনোভাবেই জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দেওয়া হবে না। কারণ তাদের সাথে আমাদের ইসলামী আকীদাগত মতবিরোধ রয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares