২০১৭ সালে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার ৬০

প্রকাশিত: ২:০০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১, ২০১৮

Sharing is caring!

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : ২০১৭ সালে বেড়েছে ধর্ষণের ঘটনা। একইসঙ্গে বেড়েছে নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা। শিশু কিংবা বৃদ্ধ কেউই বাদ যাননি এ পাশবিকতা থেকে। বিদায়ী এ বছরে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮১৮ জন নারী ও শিশু। এর আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৫৫৯। বিদায়ী বছরের তুলনায় গত বছর ২৫৭ জন নারী ও শিশু বেশি নির্মমতার শিকার হয়েছে।

এ পরিসংখ্যান দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল  ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার বিষয়ক এ সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।  প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য  বছরের মতো গত বছরও পুলিশ র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বছরটিতে এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে ১৬২ জন। যাদের মধ্যে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন ১৫৬ জন। আসকের এ সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক পর্যালোচনায় ১৫টি ক্যাটাগরিতে বিগত এক বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন আসকের সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। ফয়জুল কবির বলেন, এ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনার পাশাপাশি এ বছরেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে নতুনমাত্রা। সাবেক রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রকাশক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, পৌর মেয়র কেউই বাদ পড়েননি গুম-নিখোঁজের তালিকা থেকে। তিনি আরো বলেন, বিগত বছরগুলোর মতোই এ বছর নীতিনির্ধারক মহলের বক্তব্যে গুম, গুপ্তহত্যাসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিকে অস্বীকার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আসকের পক্ষ থেকে এসব ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদায়ী বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনার শিকার হয়েছেন মোট ৬০ জন। এরমধ্যে পরবর্তী সময়ে লাশ উদ্ধার হয়েছে ২ জনের। গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ৮ জনকে, পরিবারের কাছে ফেরত এসেছেন ৭ জন। বাকিদের এখনো খোঁজ মেলেনি। এছাড়া বছরটিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ‘রহস্যজনক নিখোঁজ’ হয়েছেন ৩১ জন। রহস্যজনক নিখোঁজের পর ফেরত এসেছেন ৯ জন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ৬ জনকে। আসক বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তাদের জনসম্মুখে হাজির করেছে বা গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে গুম হওয়া ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০১৭ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময় এবং হেফাজতে মোট ১৬২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময়ে নিহত হন ১২৬ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন ১২ জন, গ্রেপ্তারের আগে ও পরে গুলিতে মারা যান ১৮ জন, গ্রেপ্তারের পর আত্মহত্যা করেছেন একজন, অসুস্থ হয়ে মারা যান ৪ জন এবং একজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৫৩ জন, যার মধ্যে হাজতি ৩৩ এবং কয়েদি ছিলেন ২০ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে ৫৭ ধারায় সাংবাদিক, লেখকসহ মোট ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন টকশো, সংবাদ মাধ্যমে লেখা ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্য লেখক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের হুমকি ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। বিদায়ী বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হাতে শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানিসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২২ সাংবাদিক। এছাড়া রাজনৈতিক সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন এক সাংবাদিক। আসকের পরিসংখ্যান ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২১২টি প্রতিমা, পাশাপাশি ৪৫টি বাড়িঘর ও ২১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একজন নিহতসহ ৬৭ জন আহত হয়েছেন। সীমান্ত হত্যার ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৭ সালেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত ছিল। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর হাতে সীমান্তে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিভিন্ন আশ্বাস দেয়ার পরও সেটি ফলপ্রসূ হয়নি। বিএসএফ-এর বিরুদ্ধে সীমান্ত থেকে বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে নির্যাতন, গুলি করে হত্যা, এমনকি বেআইনিভাবে অনুপ্রবেশ করে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালে নারী অধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। এ বছরে বখাটেদের যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ২৫৫ জন নারী। এরমধ্যে ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী খুন হয়েছেন। এছাড়া বখাটেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন ১৬৮ জন এবং ৪ জন মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৬ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ২৪৪ জন নারী। এ বছর ধর্ষণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বেড়েছে নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা। ২০১৬ সালে ৫৫৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। আর বিদায়ী বছরে এই ঘটনার শিকার হয়েছেন ৮১৮ নারী ও শিশু। যার মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪৭ নারী আর আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন। ২০১৭ সালে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩০৩ নারী। এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ১৪৫ জনকে আর আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। এসব ঘটনায় ১৮৮টি মামলা হয়েছে। এছাড়া এ বছর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৪১ নারী। এদের মধ্যে স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের হাতে ২৭০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন ৩৪ নারী এবং নির্যাতনের ফলে আত্মহত্যা করেছেন ৫৭ জন নারী। ৪৩ জন নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে বিভিন্ন কারণে গৃহকর্তার বাড়িতে মারা গেছেন ২৬ জন। এছাড়া বছরটিতে এসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন ৩২ নারী। যার মধ্যে মারা গেছেন ১ জন। আসক তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের হিসাব মতে, ২০১৭ সালে ১৬৭২ শিশু বিভিন্নভাবে হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ৩৩৯ জন, আত্মহত্যা করে ১১৭ জন এবং রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে ৩৭ শিশুর। এছাড়া শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, উত্ত্যক্ত করাসহ ৫৬৫টি ঘটনা ঘটেছে। আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেসরকারি সংগঠন ‘সেইফটি অ্যান্ড রাইটস্‌ সোসাইটি’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ৩০৫টি দুর্ঘটনায় ৪০৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া বেতন-বোনাসের দাবিতে বিভিন্ন গার্মেন্টে বেশ কয়েকটি আন্দোলন করেছেন শ্রমিকরা। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিকারের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, চিকিৎসক, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও ত্রুটি এবং চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া নানা ভোগান্তির শিকার হয়েছে রোগীরা। আসকের সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মানবাধিকার রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, তার বাস্তবায়নের দায়িত্বও সরকারের। সকল পর্যায়ের নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করাসহ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সরকার উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করবে বলেও তিনি আশা করেন। আসকের প্রত্যাশা, মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার আরো কার্যকর ভূমিকা নেবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares