ভোটের বাক্সে পাথরের প্রভাব

প্রকাশিত: 9:26 AM, December 5, 2017

ক্রাইম ডেস্ক : বহু পাথরশ্রমিক মরে, পরিবেশ ধ্বংস হয়, আদালতের নির্দেশনা আসে তবু বন্ধ হয় না সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার অবৈধ পাথর বাণিজ্য। পাথরের নামে কাঁচা টাকার খনি এই দুই উপজেলার সঙ্গে জৈন্তাপুর উপজেলাকে নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ নির্বাচনী আসন।
স্বাভাবিকভাবেই এ নির্বাচনী এলাকার ভোটের বাক্সে পাথরের প্রভাব প্রবল। ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ আওয়ামী লীগের দিকে। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের মামলায়ও আসামি করা হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের। এ নিয়ে দলের মধ্যে চলছে দলাদলি। এসব মামলায় অহেতুক বিএনপি ও অন্যান্য মতাদর্শের লোককে জড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।
তিন উপজেলার পাথর কোয়ারির শ্রমিক ও ব্যবসায়ী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছে ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। বিছানাকান্দি, জাফলং, শ্রীপুর, ভোলাগঞ্জের মতো জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোও এ নির্বাচনী এলাকায়। পর্যটন এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বেহাল হওয়ার কারণেও ক্ষোভ আছে বর্তমান এমপির ওপর।
কোম্পানীগঞ্জের ছয়, জৈন্তাপুরের ছয় এবং গোয়াইনঘাটের নয়টি ইউনিয়ন নিয়ে এ আসনের ভোটার পাঁচ লাখের বেশি। ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সিলেট-১ আসনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ২০০৯ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে সিলেট-৪ আসনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। জাতীয় নির্বাচনে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা থেকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম হাজী মদরিছ আলী ছাড়া আর কেউ এ পর্যন্ত প্রার্থী হননি।
বর্তমান সাংসদ ইমরান আহমদ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের পর ২০১৪ সালে নির্বাচিত হয়ে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দলের মনোনয়ন দৌড়ে এ পর্যন্ত তিনিই এগিয়ে আছেন।
বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে ২০০১ সালে এ আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক সাংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম। এর আগে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে পরাজিত হন তিনি।
২০১৫ সালে এ আসনের মোট ১৪৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে শ্রমজীবী মানুষকে পুঁজি করে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে অবৈধ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। যাদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আছে স্থানীয় সাংসদের বিরুদ্ধে। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের শুরু হয়েছিল বিএনপির আমলে। ২০০১ সালের দিকে এখানে শক্তিশালী বোমামেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন শুরু হয় বলে জানান স্থানীয়রা। অভিযোগ আছে, সে সময় বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপি নীরবে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন এই ধ্বংসযজ্ঞে।
অনেকটাই বিভক্ত আওয়ামী লীগের দুর্বলতাকে এবার কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। তবে বিএনপিতেও কোন্দল প্রকট। মনোনয়ন দৌড়ে তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে তীব্র প্রতিযোগিতা। দুদলের দুর্বলতার সুযোগ নিতে এখানে শক্তিশালী প্রার্থী দিতে চায় জাতীয় পার্টি।
পুরনো মুখের সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক নবীন নেতা। তবে এখন পর্যন্ত জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী একজনই আছেন মাঠে।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঘর গোছানোর তাড়া। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাদের।
আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশায় বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদ। মনোনয়ন না পেয়ে বিগত নির্বাচনেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি।
এমপি ইমরান আহমদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত গোয়াইনঘাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মো. ফজলুল হক এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন। গত নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু পাননি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা উপজেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা মনোনয়নপ্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফতাব আলী কালা মিয়া এবং উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সিলেট জেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভানেত্রী নাসরিন জাহান ফাতেমা। দুজনই জানিয়েছেন, মনোনয়ন চাইবেন, না পেলে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিন নেতা। তারা হলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম, গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের দুবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান। তাদের মধ্যে সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিম এবং উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জনসংযোগও করছেন। অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও তার ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, সিলেট-৪ আসনে মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন তিনি।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা আহ্বায়ক এটিইউ তাজ রহমান এ আসনে দলের এক মনোনয়নপ্রত্যাশী।
এ ব্যাপারে কথা বলতে এমপি ইমরান আহমদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদ জানান, জনগণ এখন নতুনত্ব চায়। বিশেষ করে ইয়ং জেনারেশন পরিবর্তন চায়। এজন্যই বিগত নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। এবার দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী তিনি।
অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মো. ফজলুল হক বলেন, গত নির্বাচনে মনোনয়ন পাইনি। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মনোনয়ন দেন, তা হলে দল এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করব।
বিএনপির সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিম বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোভের কারণেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতিকন্যা সিলেটের সব সৌন্দর্য। পরিবেশ ও পর্যটন স্পটগুলো রক্ষায় এবং এই এলাকার উন্নয়নে প্রয়োজন পরিবর্তন। এজন্যই আমি বিএনপির মনোনয়ন চাইব। তবে দল যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটার পক্ষেই থাকবেন বলে জানান তিনি।
আবদুল হাকিম চৌধুরী বলেন, পর পর দুবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে দলীয় সমর্থন নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। কেন্দ্র থেকে আমাকে নির্বাচনী আসনে কাজ করতে বলা হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে মনোনয়ন চাইব। আমার বিশ্বাস, মনোনয়ন পাব।
জাপা নেতা এটিইউ তাজ রহমান বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশেই আমি কাজ করে যাচ্ছি। আমি দলীয় মনোনয়ন চাইব এবং আমার বিশ্বাস, দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। সূত্র – আমাদের সময়

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

December 2017
S S M T W T F
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

সর্বশেষ খবর

………………………..