সিলেট ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২, ২০২৬
সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদে কিছু মানুষ থাকেন যারা নীরবে সমাজকে আলোকিত করেন। তারা প্রচারের আলোতে আসতে চান না, কিন্তু তাদের কর্মের দ্যুতি চারপাশকে উজ্জ্বল করে রাখে। এমনই একজন সাধারণের ভিতর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন আলহাজ্ব সৈয়দ আব্দুল করীম (রহ.)। মানুষের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধেয় ‘ডাক্তার সাহেব’। গোবিন্দগঞ্জ জনতা ফার্মেসির সেই পরিচিত মুখটি আজ আর নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে অমলিন।
সৈয়দ আব্দুল করীম (রহ.) ছিলেন একাধারে একজন সফল ব্যবসায়ী এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন মানুষ। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন ‘দ্বীনের দাঈ’। দাওয়াতে তাবলীগের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে সারা দেশে তার পদচারণা ছিল। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার বিনয়ী আচরণ এবং দ্বীনি দাওয়াতের একাগ্রতা তাকে সর্বমহলে এক বিশেষ পরিচিতি ও সম্মান এনে দিয়েছিল।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না, এই শান্ত স্বভাবের মানুষটি ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় সংগঠক। তিনি ছিলেন শতভাগ দেশপ্রেমিক। যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি বন্দী হন। দীর্ঘ ৫১ দিন তার ওপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক ও নৃশংস নির্যাতন। সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা যখন তিনি বলতেন, তখন গা শিউরে উঠত। একজন গাজীর মর্যাদা নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন আমাদের মাঝে, বহন করে চলেছিলেন স্বাধীনতার সেই ক্ষতচিহ্ন।
“তিনি ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে অকুতোভয় গাজী, আর জীবনের শেষলগ্নে করোনার সাথে লড়াই করে মৃত্যুবরণকারী এক শহীদ।
২০২১ সালের ৭ এপ্রিল, বুধবার রাত ৯টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার অসুস্থতার সময়টুকু আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর হাতে যেমন অসীম কষ্ট সয়েছেন, জীবনের শেষবেলায় হাসপাতালের বিছানায় করোনার সাথে লড়াই করতে গিয়েও তিনি ঠিক তেমনি কষ্ট ভোগ করেছেন। কিন্তু তার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা এবং পরবর্তীতে বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চি ইউনিয়নের পাহাড়পুর গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও মসজিদের পাশেই তাকে দাফন করা হয়।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৪ পুত্র ও ২ কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এটি বৃহত্তর সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের জন্য এক নক্ষত্রের পতন। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে একইসাথে একজন সফল ব্যবসায়ী, দেশপ্রেমিক যোদ্ধা এবং দ্বীনের একনিষ্ঠ খাদেম হওয়া যায়।
মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাই- হে আল্লাহ, আপনি এই বীর মুক্তিযোদ্ধা, গাজী এবং দ্বীনের দাঈকে শাহাদতের মর্যাদা দান করুন। তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
স্মৃতিচারণে: সাংবাদিক আবুল হোসেন, সিলেট প্রতিনিধি, এশিয়ান টেলিভিশন।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd