সিলেট | |
প্রকাশিত: ৮:০৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২০, ২০২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক :: চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগে মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কুলাউড়া উপজেলার ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। এব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভূক্তভোগীদের আশ্বস্থ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি তাদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করেন। তাদের কেউ কেউ বর্তমানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী অথবা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যক্তির কয়েকজন নতুনভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে আগের মতোই বেআইনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও স্থানীয়দের একাংশ অভিযোগ করেছেন। বড়লেখা উপজেলার মুড়াউল বাজারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকা এবং কুলাউড়ার কয়েকটি স্থানের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ কয়েকটি গোষ্ঠী নিয়মিত তাদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক এবং বসতবাড়ি নির্মাণকারী ব্যক্তিদের কাছেও অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দাবি করা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হুমকি, হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, ভাঙচুর অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি দখলের চেষ্টার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন। হামলার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে বা প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে কথিত চাঁদাবাজি এবং সম্পত্তি দখলের প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এসব আতংকের মধ্যে গত ২০ ফেব্রুয়ারি বড়লেখা উপজেলার মুড়াউল বাজারে আনুমানিক ১৮ থেকে ১৯ জনের একটি দল সংঘবদ্ধভাবে হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, হামলাকারীরা বাজারে প্রবেশ করে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায়, ব্যবসায়ীদের হুমকি দেয় এবং কয়েকটি দোকানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে।
ঘটনার সময় শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ী মঈন উদ্দিন এবং আল হারামাইন ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল আহাদকে জোরপূর্বক তাদের নিজ নিজ দোকান থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে দোকান দুটি হামলাকারীরা নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরিবারের অভিযোগ, হামলাকারীরা আব্দুল আহাদকে জানায় যে তার দোকান তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। দোকানটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করলে তাকে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আব্দুল আহাদের ছেলে আশরাফুজ জামানকে খুঁজে পেলে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
ঘটনার সময় বাজারে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের ভয়ে কেউ তাদের বাধা দেওয়ার সাহস করেননি। এই ঘটনার পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও দোকান দখলের ঘটনার পর নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে আব্দুল আহাদ বাড়ি এবং বড়লেখা এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, একই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য এর আগে আব্দুল আহাদের ছেলে আশরাফুজ জামানকে তার সামাজিক কর্মকাণ্ড, মাদকবিরোধী প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক লেখালেখির কারণে হুমকি ও নির্যাতন করেছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে মনে করে আব্দুল আহাদ আত্মগোপন থেকে বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির হামলার পর তিনি আবারও আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।
ঘটনার পর বাজার কমিটির সদস্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা পুলিশকে বিষয়টি জানালেও, পুলিশ তাৎক্ষণিক ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে আব্দুল আহাদ বড়লেখা থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের চেষ্টা করেন। তার দাবি, অভিযোগে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে জানতে পেরে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগটি গ্রহণ বা নথিভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। প্রকাশ্য দিবালোকে দোকান দখল করা হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না।” আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, প্রতিবাদ করলে তাদের বাড়ি, পরিবার অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হতে পারে। তারা চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং সম্পত্তি দখলের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন শাহাব উদ্দিন, চেয়ারম্যান সুহেব আহমেদ, রফিকুল ইসলাম রেনু, আব্দুল মুকতাদির, শিপার উদ্দিন, কামাল হোসেন, রনি, আজির উদ্দিন, রফিক উদ্দিন, জিয়াউল ইসলাম, সালেহ আহমেদ, নাঈম হোসেন, রুহুল আমিন, কামরুল ইসলাম, কবির আহমেদ, জামিল হোসেন, সৈয়দ সেলিম হক, জাকারিয়া, নাঈম আহমেদ, ফখরুল ইসলাম, রেজাউর রহমান এবং আনসার মিয়া।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা অভিযোগগুলোর দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার এম. কে. এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, পুলিশ জেলার সকল অপরাধ নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে। লিখিত অভিযোগ পেলে নির্দিষ্ট যেকোনো ঘটনার ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে পুলিশ।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd