প্রচ্ছদ

দুষ্কৃত্যায়নের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:৫০

crimesylhet.com

Sharing is caring!

এবার যে সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে ৩০০ আসনের জন্য হাজার হাজার ফর্ম বিক্রি করে নতুন এক দিক উন্মোচন করেছে রাজনৈতিক দলগুলো।‘প্রশ্ন হলো এমন ঘটনা ঘটল কি করে? পুলিশ কি কিছুই টের পায়নি যে এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশার আয়োজনের সাথে লাঠিসোটা, আগুন আর হিংসার সব আয়োজনও মজুদ করাই ছিল?’
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে যেমন ভিড় ছিল, তেমনি বিএনপি কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়ও ছিল নির্বাচন প্রার্থী আর তার সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড়। রাজনীতির কারবারিরা ভোট গোছাতে ব্যস্ত, বিদ্বজ্জন গুছিয়ে যান আখের। কিন্তু তারুণ্য কি করবে, ভাবছি কি আমরা? যে তারুণ্য লড়ছিল শাহবাগে অধর্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সেই প্রজন্ম চেয়ে থাকবে, না কিছু করবে?

কিন্তু সেই আলোচনা আসলে এখন আর করছি না। নির্বাচন নিয়ে ভাবতে গিয়ে এক বড় প্রশ্নের সামনে আমরা সবাই-আগুন সন্ত্রাস কি তবে ফিরেছে? গত বৃহস্পতিবার, নয়া পল্টনে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যেভাবে সহিংসতার উন্মত্ত প্রদর্শনী হয়েছে, তাতে এই জিজ্ঞাসা উঠছে।

কেউ কেউ এমনটা বলছে, মনোনয়নের সময় যদি এই চেহারা হয়, তাহলে নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, কিংবা ফলাফল পক্ষে বা বিপক্ষে গেলে কি হবে? মানুষকে কি আবার আবার পুড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে?

প্রশ্ন জাগে আমাদের রাজনীতি এত সহিংস কেন? রাজনৈতিক উন্মত্ততা যেন আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের এখানে রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই সহিংস আন্দোলন। রাজনীতি মানেই আধিপত্য কায়েম আর এই ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত আছে সহিংসতার সংস্কৃতি।

এসবই রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের চিত্র। নানা আমলে এই ব্যাধি মজ্জাগত হয়েছে। দলের ক্ষমতা কায়েম রাখতে দুর্বৃত্তদের ব্যবহার করবার যে স্বভাব সেটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। পুলিশের যদি বাড়াবাড়ি থাকে, সেটা নিশ্চয়ই সবাই বলবে। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপি এবং তার নেতারা এই ঘটনায় যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তা রাজনীতিসুলভ নয়। আগুন দেয়া, লাঠি হাতে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি যারা করেছে তাদের শনাক্ত করা গেছে। সবই দলীয় কর্মী। পুলিশের সমালোচনা যখন নেতারা করছেন, তখন এই দায়ও তারা নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশিত।

কিন্তু তা হয়নি। এক তরফা অস্বীকার করার প্রবণতা প্রকারান্তরে সহিংস যুবকদের আরও ক্ষতিকর কাজ করতে উৎসাহ যোগাচ্ছে। আসলে অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাদের সৃষ্টিশীল রাজনীতি সমাজে ভাল দৃষ্টান্ত উপস্থিত করে। পাইকারি ভাবে দুর্বৃত্তদের দলে জায়গা দেয়ার কারণে এখন সহিংসতা সৃষ্টি করাই রাজনৈতিক যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবাঞ্ছিত এই ঘটনা আইনের শাসনকে উল্লঙ্ঘন করে এবং দল হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তিকে মলিন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এমন ঘটনা ঘটল কি করে? পুলিশ কি কিছুই টের পায়নি যে এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশার আয়োজনের সাথে লাঠিসোটা, আগুন আর হিংসার সব আয়োজনও মজুদ করাই ছিল?

২০১৩-১৫ সময়টিতে পরিকল্পিত দুর্বৃত্তায়ন ঘটানো হয়েছিল, প্রতিটি এলাকার চিহ্নিত সমাজবিরোধী ও দুষ্কৃতিকারীরা দল আর জোটের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মেরেছিল, পুলিশের মাথা থেঁতলে দিয়েছিল, হাজার হাজার যানবাহন ছাই করে ফেলা হয়েছিল, নিরীহ জনসাধারণকে সন্ত্রস্ত রেখে সমাজজীবনে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নগ্নতা প্রদর্শিত হয়েছিল। বলা বাহুল্য হয়তো আমাদের সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেসব ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নেয়নি কিংবা সবকিছু ভুলে গেছে তারা।

আগুন সন্ত্রাস করেও সরকার হটানো যায়নি। সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করেছে। তাই প্রত্যাশা ছিল এক নতুন রাজনীতি হয়তো দেখা যাবে, কারণ এখন এই দলের সাথে সুশীল সমাজের কিছু পরিচিত মুখ সক্রিয় হয়েছেন। এমন প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।

দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি। দুষ্কৃতিকারীরা রাজনীতির রীতি অপরিবর্তিত রেখেছে। পুলিশ বলছে এই সহিংস যুবকরা শনাক্ত হয়েছে, হয়তো তারা আটকও হবে। কিন্তু এই হিংসার দায় আসলে দলের এবং এর নেতৃত্বের।

দলীয় নেতৃত্ব যদি এই দুর্বৃত্তায়নের প্রক্রিয়ায় ছেদ টেনে ধরতে না পারে তবে, আসন্ন নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। বিএনপি দল হিসেবে যদি যথার্থ গণতান্ত্রিক পথে চলতে চায়, এবং দেশকে আগামীতে চালাতে চায় তাহলে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি হতে দলকে বের করে আনতে হবে।

কাজটি দুরূহ। রাতারাতি হওয়ার নয়। কিন্তু এ ধরনের পৈশাচিক বর্বরতাকে প্রশ্রয় দিলে, বা প্রতিপক্ষ দলের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিতে থাকলে সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করাই হবে কেবল। সত্যি বলতে কী এমরণটাই দেখে অভ্যস্ত হয়েছি আমরা। আশঙ্কা হয়, দুষ্কৃত্যায়নের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে আমাদের মুক্তি মিলবেনা কখনো।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

  •  
  •  
  •  

আর্কাইভ

shares