সদর ও গোয়াইনঘাটে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার ধুম : নিরব প্রশাসন

প্রকাশিত: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৩

সদর ও গোয়াইনঘাটে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার ধুম : নিরব প্রশাসন

Manual7 Ad Code

খলিলুর রহমান: চলতি শীত মওসুমে চলছে মাটিকাটা ও মাটি বিক্রির ধুম। ইটভাটা, গর্তভরাট, হাউজিং প্লট ভরাটে কৃষিজমির মাটি ক্রয় কওে কেটে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেট সদরের উত্তর ও গোয়াইনঘাটের সালুটিকর এলাকায় কৃষিজমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে জমির ফসল উৎপাদন। জমির মালিকরা ফসলের চেয়ে এককালীন বেশি টাকা পেয়ে মাটি বিক্রি করছে এবং মাটির ক্রেতারা অবাধে তা কিনে ইটভাটাসহ বিভিন্ন প্লট ও রাস্তায় ব্যবহার করছেন। কৃষিজমির উপরিভাগের এক থেকে দেড়ফুট করে কেটে অবাধে চলছে মাটি ক্রয়-বিক্রয়।

Manual4 Ad Code

 

গোয়াইনঘাট উপজেলার সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়কের আশপাশ প্রায় ১০ টি গ্রামের জমি থেকে প্রতিবছরই মাটি কেটে এনেই সিলেট সদরের বিভিন্ন এলাকায় থাকা ইটভাটায় পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় হাউজিং প্লট ভরাট করা হচ্ছে। ঠিকাদাররা রাস্তার কাজেও ব্যবহার করছেন। শহরতলী এয়াপোর্ট এলাকাধীন গড়ে ওঠা অনেক হাউজিংয়ে প্লট মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে।

 

সদর উপজেলার বাদাঘাট এলাকাধীন হাটখোলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমির মাটি কেটে পরিবহনের মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার মাটি ভরাট এবং ইটভাটায় বিক্রি করছে একটি মহল। বিশেষ করে চেঙ্গের খাল নদীর পারে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তেমুখী পর্যন্ত নইরপুতা, সোনতলা, লামাগাও, কাজিরগাঁও, মইয়ার চর, খোররম খলা প্রভৃতি এলাকায় নতুন করে গড়ে ওঠা কয়েকটি ইটভাটা ও ঘনঘন হাউজিং প্লটে এসব মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে জমির উর্বরশক্তি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এলাকার কাচা-পাকা রাস্তায় মাটি পড়ে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের মাটি ব্যবসায়ী প্রভাবশালী একটি চক্র মেরিন একাডেমি সংলগ্ন সতর গ্রামের বিভিন্ন ফসলি জমির মাটি কেটে ট্রাক্টর দিয়ে সোনাতলা সহ বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটা ও স্থাপনা ভরাটে পরিবহন করছে। ফসলি জমির উপর ভাগের মাটি কাটার সময় প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাহেন্দ্র ট্রাক্টর চলাচল করায় অন্যান্য জমিরও ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া ধুলায় চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে বিনষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, নারী-শিশুসহ লোকজন শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছেন।

Manual3 Ad Code

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, এলাকার প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে কৃষকদের কাছ থেকে কেনা ফসলি জমির মাটি প্রতিদিন ভেকু মেশিন দিয়ে কেটে পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং জমি হারাচ্ছে উর্বরতা।
একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে জানান, তাঁদের জমির ওপর দিয়ে অনেকটা জোর করে রাস্তা বানিয়ে মাহেন্দ্রতে মাটি নেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাঁদের ক্ষতি করে এই চলছে এই রমরমা ব্যবসা। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে। সরকার যে কোন সময় এ এলাকার জমি অধিগ্রহন করবে, এমন ধোয়া তুলে মাটি ব্যবসায়ীরা জমির মালিকদের কাছ থেকে ফসলি জমির মাটি ক্রয় করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে অন্যত্র।

 

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির উপরিস্তরর উর্বর। বছরের পর বছর ধরে সূর্যতাপে পুড়ে ও বাতাশে মাটিতে উর্বর শক্তি সঞ্চয় হয়। তা ছাড়া বৈজ পদার্থ, গাছপালা পচে জমির উপরের স্তরে উর্বরা উপাদান সৃষ্টি হয়। যা ফল-ফসল উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। তবে যদি সেই উপরের স্তর মুছে যায় বা গভীর করে কেটে নেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে জমির উর্বরতা আগের অবস্থায় ফিরতে ১০০ বছরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সিলেটে উর্বরা শক্তির কথা চিন্তা না করেই ইটভাটা ও হাউজিং মালিকের প্রলোভনে পড়ে ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। এতে ধানসহ-ফসল উৎপাদনে দেখা দিচ্ছে সমস্যা। জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় প্রতিবছর ফলন কম হচ্ছে। আবাদি জমির পুষ্টি উপাদান কমে কৃষিপণ্যের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেজ্ঞরা।

 

Manual4 Ad Code

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে বছরে প্রতিটি ভাটায় ৫০-৬০ লাখ ইট তৈরি হয়। প্রতি ১ হাজার ইট তৈরিতে ৮৮ ঘনফুট মাটির প্রয়োজন হয়। সেই হিসেবে একটি ইটভাটায় বছরে ৫ লাখ ঘনফুট মাটি দরকার হয়ে থাকে। ইটভাটার মালিকেরা এক হাজার ঘনফুট মাটি মাত্র ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকায় কৃষকের জমি থেকে কেনেন। এলাকার অনেকে জানান, কৃষকেরা জমির উর্বরশক্তির ক্ষতির দিক চিন্তা না করে সাময়িক লাভের আশায় অবাধে এসব মাটি বিক্রি করছেন।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, সিলেট সদর উত্তরের ফসলি জমি ও চেঙ্গেও খাল নদীর তীর ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ইটভাটা। ভাটাগুলোয় ফসলি জমির উপরিভাগ থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারণে দিন দিন কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে, উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। অধিকাংশ ভাটার সামনে স্তুপ করে রাখা হয়েছে জ্বালানি কাঠ। ভাটাগুলোয় তা পোড়ানো হচ্ছে। এসব ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় এলাকার বাতাস দূষিত হয়ে পড়ছে। ফলে মানুষ চর্ম, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এলাকার গাছপালাও মারে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা জানান, ইটভাটার ধোঁয়ায় এলাকায় শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

 

স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক বলেন, ইটভাটা তৈরি করতে কিছুটা অনিয়ম করতে হয়। এ ছাড়া জমি ও মাটি পাওয়া যায় না। তাই জমির মালিকদের কাছ থেকে আমরা মাটি ক্রয় করে ইট পুড়িয়ে থাকি।’

 

দেশের প্রচলিত আইনে ফসলি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে মাটি কাটলে ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা ৩ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এই আইন অমান্য করেই প্রকাশ্যে ফসলি জমির মাটি কাটা হলেও অজ্ঞাত কারণে স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ নির্বিকার।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইল সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত আজমেরী হক প্রতিবেদককে জানান, কৃষিজমির মাটিকাটা সম্পূর্ণ বেআইনী, মাটিকাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। উপজেলার যে কোনো স্থানে বেআইনী মাটি কাটার তথ্য পাওয়া গেলেই তাৎক্ষনিক অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানান তিনি।

 

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তাহমিলুর রহমানের সরকারি সেলফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।

 

সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অনুমতি ছাড়া ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Manual2 Ad Code

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

February 2023
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728  

সর্বশেষ খবর

………………………..