সিলেট ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ৭:৩০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০২৬
ক্রাইম সিলেট ডেস্ক :: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যেন অনিয়ম আর দুর্নীতির এক স্বর্গরাজ্য। এই প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতির এক জীবন্ত উপাখ্যান হয়ে দাঁড়িয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন (ওরফে আরিফ হাসনাত)। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘মুজিব বন্দনা’ আর তোষামোদি কাব্যের আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদের পাহাড়। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর রাতারাতি ‘জাতীয়তাবাদী চেতনার জার্সি’ গায়ে জড়িয়ে ভোল পাল্টাতে পারদর্শী এই কর্মকর্তা এখনো তার দুর্নীতির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে আরিফ উদ্দিনের চেয়ে বড় ‘আওয়ামী প্রেমী’ কর্মকর্তা বিআইডব্লিউটিএ-তে খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। ক্ষমতার দাপটে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। অথচ ৫ই আগস্টের পর ভোল পাল্টে নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে জাহির করছেন তিনি। বর্তমানে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক একটি বিদেশি সাদা কুকুর নিয়ে অফিস করছেন এই কর্মকর্তা। বিআইডব্লিউটিএ-র একটি সূত্রের দাবি, বর্তমান প্রশাসনের শীর্ষ মহলের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, আয়ের সাথে সংগতিহীন সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে দুদকের উপ-পরিচালক মো: হাফিজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে (স্মারক নং- ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩-৩২১৭) তার দুর্নীতির ফিরিস্তি ও রেকর্ডপত্র তলব করা হয়েছে। যদিও নথিপত্রে কৌশলে তার নাম ‘আরিফ হাসনাত’ ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিয়ে সংস্থায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল।
দুদক আরিফ উদ্দিনের ব্যক্তিগত নথি, বেতন-ভাতার বিবরণী এবং নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাট পোর্ট থেকে বিগত কয়েক বছরের ব্যাংক খাতের হিসাব বিবরণী তলব করেছে। এছাড়া তার স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসায়িক শেয়ার ও বিনিয়োগের তথ্যও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরিফ উদ্দিনের অর্জিত বিপুল সম্পদের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রূপকথাকেও হার মানায়:
ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে (বাড়ি নং- ৩০১) প্রায় ২২ কোটি টাকা মূল্যের একটি বহুতলা ভবন ক্রয় করেছেন তিনি। এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্লক-সি তে (রোড নং-১, প্লট নং- ৫৪-৫৬) রয়েছে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যার ডেকোরেশন ব্যয়ই প্রায় ৪ কোটি টাকা। ফ্ল্যাটের ভেতর রয়েছে ব্যক্তিগত সুইমিংপুল।
গুঞ্জন রয়েছে, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে তিনি আমেরিকা ও কানাডায় বাড়ি ক্রয় করেছেন। তার দুই সন্তান সাদ ও আরিন বর্তমানে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
গ্রামের বাড়ি পাবনার সুজানগরের রায়পুরে প্রায় ২০০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অন্তত ৫টি বেসরকারি ব্যাংকে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ-র সাংগঠনিক কাঠামোতে ‘আইন ও এস্টেট’ বিভাগের পরিচালক পদ সৃজনে অর্থ মন্ত্রণালয় একাধিকবার অসম্মতি জানিয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ এবং ১৫ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে অর্থ বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আর্থিক সংশ্লেষ বিবেচনায় পরিচালক পদ সৃজনে তাদের সম্মতি নেই। অথচ বিআইডব্লিউটিএ-র ওয়েবসাইটে এ.কে.এম আরিফ উদ্দিনকে ‘ল্যান্ড এস্টেট’ বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তিনি কোনো অনুমোদন ছাড়াই পরিচালকের সকল সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। এমনকি তার স্ত্রীর ব্যবহারের জন্যও রয়েছে লেটেস্ট মডেলের আলাদা গাড়ি।
শুধু আরিফ উদ্দিনই নন, বিআইডব্লিউটিএ-র চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রকৌশলী ও পরিচালক পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাই দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে প্রধান কার্যালয়ে থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে পারিবারিক ব্যবসায় পরিণত করেছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দুদক জানিয়েছে, অনুসন্ধান চলমান রয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের সম্পদ লুটেরাদের এমন কৌশলী অবস্থান এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে খোদ বিআইডব্লিউটিএ-র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—ভোল পাল্টে দুর্নীতির রাজপুত্ররা কি এভাবেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন?
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd