গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়ক ধ্বসিয়ে ফেলছে পাথরবাহী ট্রাক : থামছে না চাঁদাবাজি

প্রকাশিত: 11:56 PM, October 1, 2021

গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়ক ধ্বসিয়ে ফেলছে পাথরবাহী ট্রাক : থামছে না চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের সারুটিকর গোয়াইনঘাট আঞ্চলিক সড়কটি ধসিয়ে দিচ্ছে পাথরবাহী ট্রাক। ফলে খানাখন্দকে ভরপুর হয়ে পড়েছে এ সড়ক। অবৈধ পাথর বহনকারী ট্রাকগুলো নিয়ন্ত্রন করছে উপজেলা শ্রমিকলীগ। এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে। অথচ গত দু’বছর ধরে ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ। এর পরও খানাখন্দকে ভরপুর সিলেট-সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক। শুধু খানাখন্দক নয় পাথরবাহী ট্রাকের নিচে পড়ে বারবার প্রাণ দিয়ে হয়েছে অনেককে। প্রতিদিন সন্ধ্যা পরেই দেখা যায় নগরের আম্বরখানা থেকে তেমুখী পর্যন্ত গোয়াইনঘাট থেকে আগত শত শত ট্রাকের সারি। করোনাকালে পাথর আমদানী বন্ধ থাকার সময়ও পাথরবাহী ট্রাকের চাকায় নগরের সুবিদবাজারে মৃত্যু ঘটে শাবি ছাত্রের। এর আগে একইস্থানে এবছর মৃত্যু ঘটে সবুজ ও লতিফ নামের আরো দুই যুবকের। প্রশ্ন হলো পাথরবাহী ট্রাকগুলোতে পাথর আসে কোত্থেকে। ধলাই নদী,জাফলং না ভোলাগঞ্জ না বিছনাকান্দি কোয়ারি থেকে না মহাকাশ দ্রাঘিমা থেকে ? বস্তুত পাথরবাহী ট্রাকের কারণে লন্ডবন্ত হয়ে পড়েছে সিলেট-বিমানবন্দর-সালুটিকর ও সিলেট-সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক।
দীর্ঘ ২৪ কিলোমিটার সড়কটিতে রয়েছে অসংখ্য খানাখন্দক। এই সড়কে যাত্রীবাহী বাসের তেমন চলাচল নেই। সিএনজি অটোরিক্সাই প্রধানত যাএীবাহী বাহন। অটোরিক্সার চাপে যদি সড়ক ধসে পড়ে তা হলে বুঝতে হবে এটা কোন সড়কই নয়। সবাই বলেন অটোরিক্সা নয়, এই অসংখ্য খানাখন্দক ও ভগ্নদশার একমাত্র কারণ অবৈধ পাথরবাহী ট্রাক।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, জাফলং বিছনাকান্দি ও ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাথর বহণে কার্যকর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই পাথরখেকো ও লুটেরার দল পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কখনো দিনে আবার কখনো রাতের আঁধারে পাথর লুট করে পাথরগুলো বিক্রি করে। পাথরবাহী যানবাহনে প্রশাসনের ধরাবাঁধা না থাকায় তারা প্রকাশ্যে পাথর সাপ্লাই দিয়ে অবৈধভাবে লাখো কোটি টাকা কামাই করছে। প্রশ্ন হলো আমদানী নিষিদ্ধ বস্তু পরিবহণে ধারাবাঁধা থাকলে নিষিদ্ধ পাথর বহণে ধারাবাঁধা থাকবে না কেন? অভিযোগ পাওয়া গেছে, টাকার বিনিময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের অঘোষিত অনুমতি নিয়েই পাথর খেকো ও চাঁদাবাজরা পাথর বানিজ্য করে ও সড়কের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে সড়কটির পুনঃমেরামত কাজ হয়। কিন্তু এর দুবছর পার হতে না হতেই সড়কের এই বেহাল দশা। আর একমাত্র কারণ পাথরবাহী ট্রাকের অবাধ চলাচল। সিলেট সালুটিকর- গোয়াইনঘাট সড়কটি মূলত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের। সাধারণ যাত্রী ও পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য সড়কটি নির্মিত। এটি কোন মহাসড়ক নয়,এটি একটি আঞ্চলিক সড়ক। এই সড়ক দিয়ে পাথরবাহী ভারী যানচলাচলের অনুমোদন নেই। কিন্তু পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ভারী যানবাহন ও পাথরবাহী ট্রাক চলাচলের অনুমতি দিয়ে সড়কটির সর্বনাশ ঘটিয়ে চলেছে। ক্ষতি হচ্ছে সরকারি অর্থেও এবং দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পর্যটকসহ সাধারণ যাত্রীদের।এ সড়ক শুধু গোয়াইনঘাট উপজেলাবাসীর নয়,পশ্চিম সিলেটবাসীর যাতায়াতের একমাত্র পথ। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়া যায়। লক্ষাধিক মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছে। এলাকাবাসী বলেন, গেল আড়াই বছরে কোনো সংস্কারকাজ করা হয়নি। বাধ্য হয়ে তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে সড়কের কিছু কিছু অংশ সংস্কার করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড় থেকেই সালুটিকর বাজার। বাজার এলাকার প্রথম ভাগের এক কিলোমিটার অংশে ১০টি গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। নয়াগাঁও থেকে নন্দীরগাঁও গ্রামের মধ্যে আরও পাঁচটি গর্ত দেখা যায়। এদিকে সোনার বাংলা থেকে তোয়াকুল ও বঙ্গবীর পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের আরো বেহাল দশা।। এই অংশে কয়েকটি স্থানে সৃষ্ট গতগুরো ডোবা ও পুকুরের আকার ধারণ করেছে।
উপজেলার তোয়াকুল বাজারের ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান এমন কয়েকটি গর্ত দেখিয়ে বলেন, এসব গর্তের কারণে জনগন এই সড়ককে এখন ‘গাতওয়ালা সড়ক’ বলে থাকেন।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করে জাফলং ও বিছনাকান্দি কোয়ারী থেকে বেআইনীভাবে পাথর লুট করছে একাধিক পাথরখেকো ও চাঁদাবাজ চক্র। পাথরখেকোরা অবৈধভাবে পাথর লুট করছে, আর চাঁদাবাজরা পুলিশ ও প্রশানের নামে আদায় করছে চাঁদা বখরা ও মাসোহারা। বখরাখোর এ চক্রের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার বড়গোছা গ্রামের আমির ও ছয়ফুল,পাতনি গ্রামের ছমর এবং উপজেলার বগাইয়া গ্রামের গোলাম হোসেন। তারা নিজে এবং তাদের লোকজন দিয়ে পুলিশ ও উপজেলা প্রশানের নামে পাথর কোয়ারি থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলনে চাঁদা আদায় করে পাথরখেকোদের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি পাথরবাহী ট্রাক প্রতিও আলাদাভাবে চাঁদা আদায় করে ঝুঁকিপূণ সড়ক দিয়ে পাথর বহনের সুযোগ করে দিয়ে থাকে।
অভিযোগে আরো জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি হাফিজুর রহমান পাথরবাহী ট্রাকের প্রতিটি ট্রিপ থেকে ২শ’ টাকা করে রোড টেক্স নামে চাঁদা আদায় করে ট্রাক ছাড়িয়ে দেন। এবং অন্যরা রাস্তায় পীরেরবাজার ও লামাবাজার এলাকায় ট্রাক প্রতি পৃথক চাঁদা আদায় করে থাকে।
এ ব্যাপারে গোলাম হোসেনের সাথে মোবাইল ফোন যোগাযোগ করা হলে তিনি চাঁদা ও বখরা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারী দল যারা করেন তারাই ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করে থাকেন। আমি কোন দল করিনা, তাই সে সুযোগ আমার নেই।
গোয়াইনঘাট উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি হাফিজুর রহমানের সাথে যোযোগ করার জন্য তার মোবাইলে বারবার কল করলে তিনি এ প্রতিবেদকের মোবাইল ফোন রিসিভ করেন নি।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমান বলেন, এ সড়ক শুধু গোয়াইনঘাট উপজেলাবাসী নয়, পশ্চিম সিলেটের যাতায়াতের একমাত্র পথ। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ারও পথ। সড়কের ভগ্নদশার কারণে লাখ লাখ মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছেন। এই অবস্থায় উপজেলার সর্বশেষ মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভা থেকে সড়কটিতে দ্রুত সংস্কারকাজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ভগ্নদশার কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এলজিইডির গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, জরুরি সংস্কার কাজের জন্য একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে ১৬ কিলোমিটার অংশে সংস্কারকাজ শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া সড়কটি পর্যটন বান্ধব করতে দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ‘গাতওয়ালা’ সড়ক বলে দুর্নাম ঘুচে যাবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

October 2021
S S M T W T F
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

সর্বশেষ খবর

………………………..