পুলিশের গ্রেপ্তার বাণিজ্য টাকা দিলে মুক্তি, না হলে মামলা

প্রকাশিত: ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭

Sharing is caring!

রাত ১১টা। ব্যবসায়ী আজমল হোসেনের বাসায় হাজির পুলিশের এক টিম।
পরিবারের সবাই যখন হতবাক, একজন পুলিশ সদস্য বলেন, ‘আপনার বাসায় ইয়াবা ট্যাবলেট আছে। ’ প্রতিবাদ করলে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন মিরপুর থানার এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন ও তাঁর কথিত সোর্স শামিমুল্লাহ। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীর একটি জুতার ভেতর থেকে অভিযানকারীদের একজন তিনটি ইয়াবা বের করে নিয়ে আসেন এবং ব্যবসায়ীকে আটক করার প্রস্তুতি চলে। তখনই পুলিশের সোর্স বলে ওঠেন, ‘স্যারকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে দেন। বাইচা যাবেন। ’ নিরুপায় হয়ে আজমল চার হাজার টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেন এবং বাকি টাকা পরের দিন দেবেন বলে জানান। এসআই মেনে নিলে সোর্স বলে ওঠেন, “স্যার, তার কাছে আরো ‘বড়ি’ আছে। ” এই ঘটনা চলার খবর পেয়ে একজন সাংবাদিক তখনই ওই এসআইকে ফোন করেন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সটকে পড়লেও হাতিয়ে নেওয়া টাকা ফেরত দিয়ে যায়নি।
রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়া এলাকার কিছুদিন আগের ঘটনা এটি।
ব্যবসায়ী আজমল পরে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘ইয়াবা কী, জীবনেও দেখিনি। আমি কিছু বোঝার আগেই তারা পাশেই রাখা আমার জুতায় হাত ঢোকায় এবং কয়েকটা বড়ি বের করে। তার মানেই হচ্ছে, আঙুলের ফাঁকে ইয়াবা লুকিয়ে পুলিশ হাত সাফাইয়ের কাজটি করছিল। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টাকা না দিলে পুলিশ তো আমার নামে মিথ্যা মামলাই ঠুকে দিত। ’
ইয়াবা আটকের নাম করে এভাবেই পুলিশ বাণিজ্য করছে, এমন অভিযোগ মাঝেমধ্যেই উঠছে। কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদকের কাছেও কিছু ঘটনার তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ইয়াবা বাণিজ্যের অভিযোগে কিছু কিছু পুলিশ সদস্য আটকও হয়েছেন; তাঁদের বিচার চলছে। এ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ নাকচ করে দেননি পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দু-একটি ঘটনা সম্পর্কে আমরা অবহিত আছি। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আইজিপি বলেন, নিরপরাধ কাউকে পুলিশ কোনো ধরনের হয়রানি করলে ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের কোনো সদস্য যদি নিরপরাধ লোকজনকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশন নেওয়া হবেই।
তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে শ্যামপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, গেণ্ডারিয়া ও ডেমরায় পুলিশ ইয়াবা বাণিজ্য করছে, এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের। তারা বলছে, ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, আকারে ছোট বলেই ইয়াবা দিয়ে মানুষকে বোকা বানানো পুলিশের জন্য সহজ হয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে না গেলে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা আরো কমে যাবে। পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার সঙ্গে গতকাল যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত এক বছরে ইয়াবা দিয়ে জিম্মি করার ঘটনায় শতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে লঘু থেকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শাস্তিপ্রাপ্তরা অনেকে কলকাঠি নাড়িয়ে আগের জায়গায় ফিরে আসছে, এটা ঠিক। ভাইরে, এটা বাংলাদেশ। সব রাতারাতি বদলানো যাবে না। ’
কিছু ঘটনা : ইসলামী বক্তা মাওলানা হাবিবুর রহমান যুক্তিবাদীর নাতি মোহাম্মদ রিফাত (বয়স ১৪, আসল নাম নয়) রাজধানীর জুরাইন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। গত ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় রিফাত ও তার এক বন্ধু পোস্তগোলা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। শ্যামপুর থানা পুলিশের একটি টহল টিম তাদের গাড়িয়ে উঠিয়ে দুই কিশোরকে বলে, ‘তোমাদের পকেটে ইয়াবা আছে। ’ কিশোররা অস্বীকার করলে পুলিশের এক সদস্য তাদের একজনের প্যান্টের পকেট থেকে ২০টি ইয়াবা ট্যাবলেট বের করে বলে, ‘এই যে ইয়াবা!’ কিশোর দুটি তখন হতবাক! এ কী করে সম্ভব? খবর পেয়ে যুক্তিবাদীর গাড়ির চালক কবির হোসেন ছুটে যান থানায়। কবির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, শ্যামপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর জাকির হোসেন রিফাতসহ দুজনকে আটক করে পকেটে হাত দিয়ে নিজেই ইয়াবা ঢুকিয়ে দেন, তারপর বের করে আনেন। এরপর ৮০ হাজার টাকা দাবি করে বলা হয়, হেরফের হলে মাদক মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। কবির বলেন, ‘ওই এসআইকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে রক্ষা পাই। আর রিফাতের বন্ধুকে ছাড়িয়ে আনতে তার বাবা পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন। ’ তবে অভিযোগ সম্পর্কে এসআই জাকির হোসের কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা অপবাদ। ওই সময় কাউকে আটক করিনি। আর টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। ’
ইয়াবা বাণিজ্য করতে গিয়ে পুলিশ হাতেনাতেও ধরা পড়ছে। চলতি বছরই ঢাকার অদূরে দোহারে মারুফ খান নামের এক যুবককে আটক করেন দোহার থানার এএসআই রফিকুল ইসলাম। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মারুফের শার্টের পকেটে ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করে পুলিশ। মারুফ প্রতিবাদ করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। তারা এএসআইকে উল্টো আটক করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খবর দেয়। এ সময় এএসআই লোকজনের কাছ ক্ষমা চান। মারুফ খান অভিযোগ করে বলেন, ‘সোর্সদের মাধ্যমেই পুলিশ আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে। থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে এএসআই রফিককে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ’
গত ২৭ জুনের ঘটনা। পল্টন থানা এলাকার শান্তিনগর থেকে ডেইলি অবজারভার পত্রিকার ফটো সাংবাদিক আশিক মোহাম্মদ আটক হন। আশিকের ঘনিষ্ঠজনরা বলছে, থানার সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর আশরাফ খারাপ ব্যবহার করলে আশিক প্রতিবাদ করছিলেন। একপর্যায়ে ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেট আশিকের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে মামলা ঠুকে দেন আশরাফ। আশিকের পরিবার ও তাঁর সহকর্মীরা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, এক লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে মামলা তোলার কথা বলেছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর মিজান। আশিকের পরিবার পাঁচ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়, পুলিশ নাকচ করে দেয়।
গত ৬ জুলাই ফরিদপুরের সদরপুরে প্রাইভেট কারচালক শ্রাবণ ইসলামকে ৫১টি ইয়াবাসহ আটক করে সদরপুর থানার এসআই আব্দুল আজিজ ও এএসআই সোহেলসহ একদল পুলিশ। ৭ জুলাই শ্রাবণের পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে বলে, এক লাখ টাকা চেয়ে না পেয়ে পুলিশ ইয়াবার গল্প ফেঁদেছে। তবে পুলিশ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, শ্রাবণ তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। এ ছাড়া গত বছরের ৩০ আগস্ট ঢাকার রূপনগর থেকে আটক করা হয় বিসিআইসি কলেজের ছাত্র মুজাহিদুল ইসলামকে। তার ভাই মাসুম সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ ধরে তাঁর ভাইয়ের পকেটে দুটি ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দেয়। পরে ১০ হাজার টাকা দিলে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
রানা আহমেদ ও মো. আজাদ নামের দুই ব্যবসায়ীকে আটকের পর একজনকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং অপরজনকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগে আদালতে গত ৯ জুলাই চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ, এসআই আবছার উদ্দিন রুবেল ও কনস্টেবল পাপ্পুকে আসামি করে মামলা করা হয়। আসামিরা দুই ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারেরও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্য।
চট্টগ্রামে ইয়াবা বাণিজ্যের বেশ কয়েকটি ঘটনায় একাধিক পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার হয়েছেন এবং বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। গত ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরের চান্দগাঁও থানার কাপ্তাই রাস্তার মাথায় যাত্রীবাহী একটি বাসে তল্লাশির সময় অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজের সাংবাদিক মোস্তাফা ইউসুফকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন দুই কনস্টেবল। ইউসুফ গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া থেকে নগরের অফিসে ফিরছিলেন। পরে চান্দগাঁও থানার মোহরা পুলিশ বক্সে দায়িত্বরত কনস্টেবল নাজমুল হাসান ও তন্ময়কে প্রত্যাহার করা হয়। ২০১২ সালের এপ্রিলে কোতোয়ালি থানার লাভ লেন এলাকার আবেদীন কলোনির একটি বাড়ির মালিককে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসাতে গিয়ে ধরা পড়েছিল র্যাবের সোর্স এবাদুল। গত বছরের নভেম্বর মাসে পটিয়া থানার উপপরিদর্শক নাদিম মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি ইয়াবা দিয়ে নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে দিয়ে টাকা আদায় করছেন। ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় পুলিশের তিন এসআইয়ের কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। এই ঘটনায় উপপরিদর্শক শাহাদাত হোসেন, জুয়েল সরকার ও শেখ সজীবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সাইফুদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় নগর গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই আহমেদ নূরকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামের ৬০ বছর বয়স্ক বাসিন্দা আলী আকবরকে টেকনাফ থানার এসআই একরামুজ্জামান গত ২০ রমজান রাতে তাঁর ঘর থেকে তুলে নিয়ে যান। আলী আকবর স্থানীয় আওয়ামী লীগের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি। আলী আকবর জানান, চোখে কাপড় বেঁধে পুলিশ থানায় তাঁকে আটকে রাখে। এসআই একরাম একপর্যায়ে তাঁকে বলেন, ‘১৫ লাখ টাকা না দিলে ইয়াবা নিয়ে চালান দেব। শেষ পর্যন্ত আমার পৈতৃক ছয় কানি (চার একর) জমি বন্ধক দিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে আমি মুক্তি পাই। ’ টেকনাফ থানার গেটের মোবাইল বিকাশের দোকানি নুরুল মোস্তফাকে এসআই রহিম ধরে নিয়ে যান ইয়াবা পাচারকারী ও হুন্ডি কারবারের অভিযোগে। তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত দুই লাখ ১০ হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গত ৫ জুলাই রাতে টেকনাফের হাজি গনি মার্কেটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাশেদকে ধরে এসআই মনোয়ার ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দুই লাখ টাকায় রফা হয়। এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযোগগুলো খুবই উদ্বেগজনক। পুলিশের যারা এসব অপকর্ম করে আসছে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে মাদকের ব্যবহার কমে আসবে। তাঁর মতে, কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এসব অপকর্ম করতেই থাকবে অসাধু পুলিশ সদস্যরা।
নিয়মিত ইয়াবা চালান ধরা পড়া, ব্যাপক হারে তরুণ-তরুণীদের ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়াসহ নানাভাবেই স্পষ্ট যে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা বাংলাদেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি মিয়ানমারে সহিংসতার জের ধরে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার এই অস্থির সময়েও থেমে নেই চক্রটির অপকর্ম। সীমান্তেও দুই পাড়েই ধরা পড়েছে কোটি কোটিসংখ্যক ইয়াবা।

সূত্র- কালের কন্ঠ

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

November 2017
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares