সিলেটে আবুল-নুরুলকে কোটি টাকা মাসোয়ারা দিয়ে চলছে নম্বরবিহীন অটোরিকশা

প্রকাশিত: ৩:৫৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২০

সিলেটে আবুল-নুরুলকে কোটি টাকা মাসোয়ারা দিয়ে চলছে নম্বরবিহীন অটোরিকশা

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ। এরপরও সিলেটের মহাসড়কে অবাধে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে অটোরিকশা দিয়ে। মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্ট্যান্ডও।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা মহাসড়কে চলাচল করায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সর্বশেষ দুর্ঘটনা ঘটেছে গত ১৩ আগস্ট। ওসমানীনগরের বেগমপুর এলাকায় ওই দুর্ঘটনায় সিলেটগামী বাসের সঙ্গে মৌলভীবাজারগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ পাঁচ যাত্রী ও চালকের মৃত্যু হয়।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে সব মহাসড়কে অটোরিকশা, টেম্পোসহ তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে আদেশ জারি করে সরকার। তবে বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। সিলেটে মানা হচ্ছে না এ নিয়ম।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোন নিবন্ধন নেই। শুধু পেছনে লেখা রয়েছে আবেদিত বা অনটেস্ট। এইটুকু লিখেই সিলেটে বছরের পর বছর ধরে চলছে সহস্রাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
এতে লাভবান হচ্ছেন কিছু শ্রমিক নেতা আর পুলিশের কিছু লোক। মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রাজপথে এগুলো চলার বৈধতা দিয়েছেন তারা। এছাড়া এসব অটোরিকশার চালকদেরও নেই কোন লাইসেন্স। সমিতির সদস্য হলেই গাড়ি চালানো যায়, এতে তাদের কোন ভোগান্তি পোহাতে হয়না। সিলেট নগরী থেকে শুরু করে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট, সালুটিকর, বিছনাকান্দি, হাদারপাড়সহ বেশ কিছু এলাকায় এভাবেই চলছে এসব অবৈধ অটোরিকশা।
সম্প্রতি সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ পিপিএম একটি অনুষ্টানে বলেছিলেন ‘সিলেট জেলার সড়কগুলোতে কোন রকম নম্বারবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে না। সকল নম্বারবিহীন সিএনজি অটোরিকশা বন্ধ করার ঘোষণা দেন তিনি। এই ঘোষণার পর কিছুদিন থানা পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরবর্তিতে আবার যেই লাউ সেই কদু।
কিন্তু পুলিশ সুপারের এই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি চক্র পুলিশের কিছু অসাধু কর্তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরী করে টাকার বিনিময়ে অভিযান বন্ধ করে দেন। এই চক্রের মূলহোতা আবুল ও নুরুল। যাদেরকে মানুষ টোকেন বিক্রেতা হিসাবে চিনেন।
জানা যায়, সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের আম্বরখানা-সালুটিকর শাখার সভাপতি আবুল হোসেন খান ও বৃহত্তর জৈন্তা সিএনজি মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি, সিলেট জেলা সিএনজি চালিত অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন রেজি নং ৭০৭ এর সদস্য ও ৫নং ফতেহপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নুরুল হকের ছত্রছায়ায় নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলায় চলাচল করছে এসব অবৈধ অটোরিকশা। পুলিশ, সমিতির নেতা, বিআরটিএ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে এসব সিএনজি অটোরিকশা চলছে। অবৈধ অটোরিকশাকে ‘বৈধতা’র বিনিময়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি সংগঠনের শাখা রয়েছে আম্বরখানা ও সালুটিকরে। এই শাখার অধীনে অবৈধ অটোরিকশা রয়েছে হাজারখানেক। প্রতিটি গাড়ির নম্বর প্লেটে লেখা রয়েছে- ‘সিলেট-থ-১২-আবেদিত’। প্রতিটি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে ১৫শ টাকা করে আদায় করেন অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা আবুল। ওই টোকেনে চলা যায় এক মাস। প্রতি মাসে টোকেন না নিলে সমস্যায় পড়তে হয় চালকদের।
এদিকে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, হরিপুর, জাফলং টু সিলেট হাজার হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। যার বিনিময় নুরুল হক উরফে টোকেন নুরুল তার লোকজন দিয়ে নিয়মিত টাকা আদায় করছে। এই টাকার ভাগ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্তাদের টেবিলে পাঠিয়ে দেন নুরুল।
তাদের স্বাক্ষরিত টোকেন দিয়েই বছরের পর চলছে এখানকার অবৈধ ‘সিলেট-থ-১২-আবেদিত’ অটোরিকশাগুলো। নিবন্ধনহীন সহস্রাধিক সিএনজি অটোরিকশা বাবদ প্রতিমাসে উত্তোলন করা হয় লাখ লাখ টাকা।
আম্বরখানা-সালুটিকর শাখার চালকরা জানান, উত্তোলিত টাকার ভাগ পান সমিতির নেতা আবুল খাঁন, এয়ারপোর্ট থানা, আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ি, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ।
চালকরা আরও জানান, মাসোহারা টোকেন দিয়েই রাস্তায় চলছে এসব গাড়ি। আর এই টোকেন পুলিশ টোকেন হিসাবে পরিচিত। প্রশাসনের যথাযথ তদারকির অভাব আর কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার অসাধুতার কারণে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না অনটেস্ট সিএনজি অটোরিকশা বাণিজ্য।
স্থানীয় কয়েকজন চালকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নুরুল ও আবুলের রোডগুলোতে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার চালকদের নেই কোন লাইসেন্স। কারো কারো লাইসেন্স রয়েছে। সেটি জাল বলেও জানান অনেক চালক।
ওই রোডে চলাচল করতে কোন লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়না। এছাড়া বিআরটিএ অফিসে গেলে তাদের ঘিরে ধরে দালালরা। লেখাপড়া কম জানার কারণে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় বেশী টাকা। একটি লাইসেন্স করতে দালালরা ১০ হাজার টাকা নেয়।
ওই রোডে চলাচলকারী অনটেস্ট সিএনজি অটোরিকশার মালিকরা পুলিশ টোকেন দিয়ে রাস্তায় এসব গাড়ি চালাচ্ছে। আবার অনেক সিএনজি অটোরিকশার মালিক এ ধরণের ঝুঁকি না নিয়ে অপেক্ষার পর কম দামে গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। তার দুটি গাড়ির মধ্যে এধরনের একটি গাড়ি অনেক কমদামে কেনেন বলে জানান।
অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন আম্বরখানা সালুটিকর শাখার অফিস সূত্রে জানা যায়, এই শাখার অধীনে হাজার খানেক আবেদিত অটোরিকশা রয়েছে। এই শাখার আওতায় রয়েছে আম্বরখানা স্ট্যান্ড, এয়ারপোর্ট স্ট্যান্ড, কোম্পানীগঞ্জ স্ট্যান্ড, গোয়াইনঘাট স্ট্যান্ড, সালুটিকর স্ট্যান্ড, ভোলাগঞ্জ স্ট্যান্ড, পারুয়া স্ট্যান্ড, দয়ারবাজার রাধানগর স্ট্যান্ড। এ সকল এলাকার সকল পুলিশ ফাঁড়ি ও থানার সঙ্গে মৌখিক চুক্তি রয়েছে শ্রমিক ইউনিয়নের। প্রতিটি চেকপোস্টে তাদরে স্বাক্ষরিত টোকেন দেখালেই অবৈধ অটোরিকশা ছেড়ে দেয় পুলিশ। কয়েক বছর ধরে এভাবেই ‘আবেদিত’ লেখা গাড়িগুলো চলছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর ও গণমাধ্যম) মো. লুৎফর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। তবে কোনো ধরনের লেনদেন কিংবা টোকেনের ব্যাপারে জেলা পুলিশ জড়িত নয়।
সিলেট নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, টোকেনের মাধ্যমে নম্বরবিহীন অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। অবৈধ যেকোনো যানবাহন পেলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

সর্বশেষ খবর

………………………..