সিলেট ৭ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০২৫
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি :: সুনামগঞ্জের ছাতকে বিদ্যুৎ সংযোগ ও লাইন সংস্কারের নামে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা চাঁদা ও প্রতারণার মাধ্যমে আদায়ের ঘটনায় মামলার সাক্ষীদেরকেও আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম নয়ন গত ৯ অক্টোবর সকালে সুনামগঞ্জ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তদন্তে সাক্ষী আনোয়ার ও রুবেলসহ মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। চার্জশিট দাখিলের পরপরই তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়ে থানাছাড়া হন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট পিডিবি প্রজেক্ট অফিসের অধীনে ছাতক উপজেলায় পুরাতন এলটি (লো-টেনশন) লাইন সংস্কারের নামে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল একটি প্রভাবশালী চক্র। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক হাজী শহিদুল তালুকদার, তার ভাই কামাল তালুকদার, শ্যালক মাসুম চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান ওরফে ফাহাদ, ছাতক উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল আহমদ, জাউয়াবাজার ইউনিয়নের যুবলীগ নেতা ছাদ মিয়া, কৈতক গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ আলী এবং দোয়ারাবাজারের সাবেক এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আজিজ রহমানসহ কয়েকজন এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি ছাতকের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিদ্যুৎ খুঁটি স্থাপন, ট্রান্সফরমার বসানো ও নতুন সংযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পাঁচ শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করে। কেউ দিয়েছে ১০ হাজার, কেউ ৫০ হাজার, আবার কেউ এক লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতারণার মাধ্যমে তারা মোট ৫ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানিয়েছেন, চক্রের সদস্যরা সরকারি প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখাত। তারা বলত—“টাকা না দিলে সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে, বা নাম বাদ যাবে।” অথচ বাস্তবে কাজের অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত ধীর। এক বছরের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায় গত ১৭ মার্চ রাতে, যখন ছাতক সেনাক্যাম্পের ক্যাপ্টেন শোয়েব বিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল উপজেলার দেওকাপন গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে দুজনকে নগদ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। আটকরা হলেন—মাসুম চৌধুরী (৪৭), টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলার কাউলজানী গ্রামের সাহাদাত আলী চৌধুরীর ছেলে, এবং ফজলুর রহমান ওরফে ফাহাদ (৩২), কালিহাতি উপজেলার গুহকোনা গ্রামের বাদশাহ মিয়ার ছেলে। তারা দুজনই ছাতকের কৈতক গ্রামের এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
অভিযান চলাকালে তারা দেওকাপন গ্রামের এক বাসিন্দার কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করছিলেন—এমন সময় স্থানীয়রা বিষয়টি সেনা টহল টিমকে জানায়। সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে। পরদিন ১৮ মার্চ সকালে দুজনকে আদালতে পাঠানো হয়। এর আগে একই রাতে দেওকাপন গ্রামের সাইদুল হক বাদী হয়ে ছাতক থানায় প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। প্রধান আসামি করা হয় হাজী শহিদুল তালুকদারসহ তার ভাই, শ্যালক ও সহযোগীদের।
তবে তদন্তে সাক্ষী আনোয়ার ও রুবেলকেও অপরাধে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। এর প্রেক্ষিতে তাদের নামও আসামির তালিকায় যুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি পিডিবি প্রজেক্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কাজের অনুমোদন ছাড়াই তারা সংযোগ ও মেরামতের আশ্বাস দিত।
এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে যারা বছরের পর বছর প্রতারণা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। ভুক্তভোগীরা আদালতের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ হারিয়েছি। এখন ন্যায়বিচারই আমাদের একমাত্র চাওয়া।”
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুতবিচার আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতের নামে কোনো চাঁদাবাজ চক্র আর সক্রিয় হতে না পারে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, “তদন্তে নিশ্চিত হয়েছি, বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অবশ্যই সুবিচার পাবেন।”
এব্যাপারে থানার ওসি সফিকুর রহমান খান বলেন, “চাঁদাবাজি করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে দুজন ধরা পড়েছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে একটি বৃহৎ প্রতারণা চক্রের তথ্য। পাঁচ বছর ধরে তারা বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে ৯ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছেন।”
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd