প্রচ্ছদ

কানাইঘাটে ভিজিএফ চাল আটক নিয়ে চাঞ্চল্য

১০ জুন ২০১৯, ১৭:৪২

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক :

Sharing is caring!

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ৯নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নে সরকারকর্তৃক গরীব-দুস্থ্যদের জন্য বরাদ্ধকৃত ‘ভিজিএফ’ চাল আটক নিয়ে চাঞ্চল্যর সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে নাটকীয় মামলায় হতবাক স্থানীয় জনসাধারণ। স্থানীয় চাঁদাবাজের এহেন কান্ডে হতবাক সিলেট আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ মিডিয়াকর্মীরা। যদিও ‘ভিজিএফ’ চাল আটককারীরা দাবী করছে চালগুলো কালোবাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ার পথিমধ্যে তারা আটক করেছে। স্থানীয় সুবিধাভোগীসহ পরিষদের চেয়ারম্যান ও ৯জন মেম্বার ও ৩ মহিলা মেম্বারের দাবী পবিত্র ঈদুল ফিতরে আগের দিন আর দিনভর বৃষ্টির কারনে সুবিধাভোগীদের মাঝে চালগুলো দ্রæত পৌঁছে দিতে ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের নয়াবাজারে এবং ইউনিয়ন পরিষদে বিতরনের সিদ্ধান্ত নেন পরিষদের সবাই। বিষয়টি তাৎক্ষনিক পরিষদের সভায় বসেই লাইড স্পিকার দিয়ে কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানিয়া সুলতানাকে মোবাইল ফোনে অবগত করেন চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম। সে সময় তানিয়া সুলতানা নির্দেশ দেন চালগুলো দ্রæত যে কোন ভাবে হউক সুবিধাভোগীদের মাঝে দ্রতি পৌছেঁ দেওয়ার। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মৌখিক নির্দেশ পেয়েই ইউনিয়নের ১ থেকে ৫ নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীদের চাল রাজাগঞ্জ বাজারস্থ ইউনিয়ন পরিষদে বিতরণ শুরু করে পরিষদের সবাই। বাকি ৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩,৪,৫ নং ওয়ার্ডের চাল পরিষদ থেকেই বিতরন কিছুক্ষণ পরই শুরু হবে জানানো হয়। ঈদের কারণে বাজারে প্রচন্ড ভিড় আর বৃষ্টি বাদলের কথা বিবেচনা করে ৬-৯ নং ওয়ার্ডের চালগুলো স্থানীয় নয়াবাজারে বিকাল ৪টা থেকে বিতরন করা হবে বলে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এসময় স্থানীয় ৬টি ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীদের মাঝে বিষয়টি জানাতে মসজিদের মাইকিং করা হয়। খবর পেয়ে নয়াবাজারে ভিড় করতে শুরু করেন স্থানীয় ৪টি ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীরা। কিন্তু পরিষদ থেকে নয়াবাজারে চালগুলো নিয়ে যাবার পথে স্থানীয় খালোপার ময়ূরমাটি নামক স্থানে চালবাহী গাড়ীর গতিরোধ করে এলাকার চিহ্নিত দুষ্কৃতিকারীরা। এ সময় তারা ৭ বস্তা চাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় চালবাহি ট্রাক্টরের সাথে থাকা সংশ্লিষ্ট ৪টি ওয়ার্ডের মেম্বার ও ৩ জন গ্রাম পুলিশ, ইউনিয়ন আনসার ডিপি কামান্ডারকে নাজেহাল করে। ইফতারের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত সুবিধাভোগীরা চাল না পেয়েই খালি হাতে বাড়ি ফিরেন। চাল আটকের বিষয়টি চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামকে জানানো হলে মোবাইল ফোনে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানিয়া সুলতানাকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি উপজেলা ভ‚মি কর্মকর্তা লুসিকান্ত (এসিল্যান্ড) কে ঘটনাস্থলে প্রেরণ করেন। পাশাপাশি তিনি থানার ওসিকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনিও থানার এসআই আবু কাউসারকে ঘটনাস্থলে পাঠান। এসিল্যান্ড ও এসআই কাউসার ঘটনাস্থলে এসে চাল আটকের বিষয়টি সত্যতা পান। চালগুলো সুবিধাভোগীর মাঝে তাৎক্ষনিক বিতরনের চেষ্টা করলে এতেও বাধা হয়ে দাড়ায় উল্লেখিত স্থানীয় দুস্কৃতিকারীরা। বাধ্য হয়ে সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্ধকৃত চালগুলো বিতরণ না করেই তিনি সাথে করে নিয়ে যান এবং থানার একটি গোদাম ঘরে রাখেন। এ ঘটনায় রাজাগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম ৪ তারিখ রাত ১০টা দিকেই বাদী দুস্কৃতিকারী লুৎফুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, দুদু মিয়া, মুসলেহ উদ্দিন, ছালিম আহমদ, জাহেদ আহমদ, শিব্বির আহমদ, গোলাম আলীসহ সঙ্গবদ্ধ চক্রটির বিরুদ্ধে লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এ সময় স্থানীয় এসিল্যান্ড লুসিকান্ত সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিলেট থেকে আসতেছেন, তিনি রাস্তায় আছেন এসে ব্যবস্থা নিবেন। কিন্তু রাতভর অপেক্ষার পরও নির্বাহী অফিসার আর আসেননি। পরদিন সন্ধ্যায় নির্বাহী অফিসারের সাথে দেখা করেন কানাইঘাট উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানগণ। এ সময় সকলের সম্মুখেই তারা ঘটনার বিস্তারিত অবহিত করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই স্বীকার করেন চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম তাকে মোবাইল ফোনে চাল বিতরনের বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি পরিস্তিতির স্বীকার, কারণ তিনি জেলা প্রশাসককে জানিয়ে দিয়েছেন উপজেলার সব কয়টি ইউনিয়নে ভিজিএফ এর চাল বিতরণ শেষ হয়ে গেছে। এ ঘটনার তিনি ইমেজ সংকঠে পড়েছেন। লিখিত না থাকায় তিনি কিছুই করতে পারছেন না। এ সময় তিনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শীর্ষন্দু পুরকায়স্থ বাদীকে বাদী করে কোন জনপ্রতিনিধিকে আসামী না করে ভিজিএফ এর চাল বিতরনে অব্যাবস্থাপনার দায় ও সঠিক তদন্তদাবী করে একটি এজাহার দাখিলের নির্দেশও দেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছিলেন তদন্তে পূর্বক চাল বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে অথবা চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের ফাঁসানোর জন্য ভিজিএফ এর চাল যদি আটক করা হয়ে থাকে তাহলে যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই বক্তব্য পিআইও স্থানীয় সাংবাদিকদের দিয়ে ছিলেন, যা একাধিক পত্রিকাও অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু ঘটনার ৩দিন পরে অদৃশ্য চাপের মুখে সেই এজাহারটি থানা থেকে প্রত্যাহার করে একমাত্র চেয়ারম্যানকে আসামী করে নতুন ভাবে আরেকটি কল্পিত এজাহার দায়ের করেন পিআইও। যেটি দেখে হতবাক স্থানীয় সংবাদকর্মীসহ ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানগন। তাহলে কি উপজেলা নিবার্হী অফিসার তানিয়া সুলতানার মৌখিক নির্দেশের কোন ভিত্তিনেই। নাকি তিনি মুখে বলেন এক আর কাগজে কলমে আরেক। পিআইও শিষেন্দু যে এজাহারটি ৪ তারিখ থানায় দায়ের করেছিলেন কিংবা পরে তুলে নিয়ে নতুন করে এজাহার দায়ের করলেন এর রহস্যটাইবা কি। নাকি ঘটনার পিছনের কলকাঠী অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর তাদের খুশি করতেই এমন এজাহার দায়ের। বিষয়টিতো উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজের কাছে রেখেই তদন্তটিম করে পরে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা দায়ের করতে পারেন। এজন্য উক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার। সরেজমিন গেলে স্থানীয় জনসাধারণ অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের ফাঁসানোর জন্য বিতরনের জন্য নিয়ে যাওয়া ভিজিএফ এর চাল আটক করে কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগের নাটক সাজিয়েছে কতিপয় এসব ব্যক্তিরা। কারণ ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য মিনহাজ উদ্দিনের সাথে পূর্ব শত্রæতার জেরেই নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়েছে। যারা চাল আটক করেছিলেন তাদের পক্ষ থেকে কেউই এরির্পোট লেখা পর্যন্ত থানায় কোন অভিযোগও দায়ের করেননি। এ দিকে আটককৃতদের দাবী অনুযায়ী ৫০ বস্তা চাল তারা আটক করেছে। কিন্তু থানায় নিয়ে আটককৃত চালের পরিমান ৪৩ বস্তা পাওয়া যায়। এমনটাই জানিয়েছেন ঘটনাস্থল থেকে চাল উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া এসআই আবু কাউসার। প্রশ্ন হচ্ছে ৫০ বস্তা চাল আটক করা হলে বাকি ৭ বস্তা চাল গেলো কোথায় বা নিয়ে গেলো কারা? এখনকি বাকি ৭ বস্তা যারা নিয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হবেনা। কিন্তু ৩ দিনের নাটকীয়তার পর শুক্রবার নতুন এজাহারে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আসামী করায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে এলাকায়। স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগ, দুস্থ্য গরিবের চাল যারা আটক করে কালোবাজারের বিক্রির নাটক সাজিয়েছে তারা এলাকার চিহ্নিত খারাপ লোক, তাদের বিরুদ্ধে কানাইঘাট থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে। ভিজিএফ এর চাল আটকের ঘটনায় উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় তারা এনিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও স্থানীয় সংসদ সদস্য হাফিজ মজুমদারসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে দেখা করে নাটকের বিষয়টি তুলে ধরেন। ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় মেম্বারগণ বলেন, চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামসহ ইউপি সদস্যদের বিরুদ্ধে ভিজিএফ এর চাল আত্মসাতের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এভাবে যদি প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে জনপ্রতিনিধিদের হেনস্থা করা হয় তাহলে চেয়ারম্যানরা কোন অবস্থাতেই মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে উপজেলা পরিষদ বয়কট করা হবে। তাদের সম্মুখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার চেয়ারম্যানের ফোনের বিষয়টি স্বীকার করার পরও যে নাটকের সূচনা হয়েছে তা কোন অবস্থাই কাম্যনয়। অপর দিকে রবিবার রাতেই স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন ৮টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানগণ। এ সময় তারা চাল আটকের বিষয়টি ষড়যন্ত্র আখ্যায়িত করে চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি ও উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত পূর্বক প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান। ইতিমধ্যে চেয়ারম্যানবৃন্দ উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল ও কানাইঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল আহাদের সাথে সাক্ষাত করেন। ভিজিএফ’র চাল আটক নিয়ে কানাইঘাট প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অনুসন্ধান পূর্বক সঠিক তথ্য উপাত্ব্য জনসম্মুখে তোলে ধরার দাবী জানান তারা। এসময় উপস্থিত ছিলেন কানাইঘাট ১নং লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউপির চেয়ারম্যান ডাঃ ফয়েজ আহমদ, লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউপির চেয়ারম্যান জেমসলিও ফারগুশন নানকা, দিঘীরপার ইউপির চেয়ারম্যান আলী হোসেন কাজল, ৪নং সাতবাক ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুন নূর, বড়চতুল ইউপির চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হোসেন, সদর ইউপির চেয়ারম্যান মামুন রশিদ, বানীগ্রাম ইউপির চেয়ারম্যান মাসুদ আহমদ, ঝিঙ্গাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দিন। অপরদিকে চেয়ারম্যান মেম্বারদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারের দাবীতে শনিবার স্থানীয় নয়াবাজারে বিশাল এক প্রতিবাদ সভা করেন স্থানীয় জনসাধারণ। মামলা প্রত্যাহার না হলে প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পরে ডিসি অফিস ঘেরাও করবেন বলে জানান তারা।

  •  
  •  
  •  

আর্কাইভ

June 2019
S S M T W T F
« May    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
shares