সিলেট ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১লা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ১:১৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৫
মোঃ মঈন উদ্দিন মিলন, কোম্পানীগঞ্জ :: সিলেটের দীর্ঘতম দৃষ্টিনন্দন ধলাই সেতুর পাশে থেকে বালু উত্তোলনে শংকায় পড়েছে সেতুটির ভবিষ্যত। তাই ব্রীজ বাঁচাতে এলাকাবাসীসহ উপজেলার সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়ী সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়াজ তুলে প্রতিবাদ,মিছিল,স্মারকলিপি দিয়েছেন বহুদিন ধরে। বালুখেকোদের হুমকি, ধমকিতে এখন সবাই ক্লান্ত।
আলোচিত সাদা পাথর লঙ্কাকাণ্ডে তৎকালীন জেলা প্রশাসক,উপজেলা প্রশাসন,ওসি কর্তাগণের অবহেলা ও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে প্রত্যাহার করা হয় সরকার মশাইয়ের উর্ধতন কর্মকর্তার মাধমে।
নবাগত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ইউ,এন,ও ওসি যোগদানের ফলে অনেকটা সরব হলেও থামানো যাচ্ছেনা বালু লুটপাট কারীদের তান্ডব। এতে সেতুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সংকট চরমে।
সরেজমিন পরিদর্শনে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে ধলাইর দক্ষিণ বালু মহাল লীজ গ্রহীতা, নদীর তীর ও সেতু সংলগ্ন এলাকার কয়েকটি গ্রুপ সিন্ডিকেট তৈরি করে ১০/১২ টাকা ফুটে শত শত ষ্টীলবডিতে দিন/রাতে বেচাকেনা হয়।এতে কয়েক হাজার ফুট বালু বিক্রিতে প্রতিদিন কয়েক লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বালু খেঁকো চক্র।
যন্ত্রদানব লিষ্টার ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে ৫০/৭০ ফুট গভীর খাদ করে মধ্য রাত থেকে সকাল ১০ টা অবধি মাঝারি নৌকা থেকে শুরু করে ষ্টীলবডি বড় নৌকায় দেদারসে সেতু এলাকা ও তীরবর্তী বাড়ীঘর ধংস করে নদী গর্ভে বিলীন করে দেয়া হচ্ছে। এতে বিশেষ করে সেতুটির যেকোনো মূহুর্তে পিলার হেলে পড়লে বৃহৎ এলাকার একমাত্র সহজতম মাধ্যম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আরোও বিলীনের পথে কলাবাড়ী খেলার মাঠ ও কবরস্থানসহ বসতবাড়ি।
উল্লেখ্য সম্প্রতি দিনে রাতে বালু উত্তোলনের হিড়িক এর চিত্র অন্যদিকে অভিযানের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় চাউর। তবুও টনক যেনো নড়েনা দুষ্কৃতকারীদের। ফেইসবুক ব্যবহারকারী স্হানীয় অধিবাসী ও মাদ্রাসা শিক্ষক হাফিজ জামাল উদ্দিন তার আইডিতে লেখেন,
“ধলাই ব্রীজ তুমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? রাতের আঁধারে, বৃষ্টির সুযোগে দিনে রাতে সেতুর নিকটে বালু তুলার হিড়িক! মোবাইলে পোষ্ট হয়,পুলিশ আয় তাড়ানি দেয় আবার হুলি শুর!হায় কি নিদারুণ তামাশা!আফসোস! মানুষের বিবেকের! সব ধংস হোক আমার টাকা চাই। এভাবেই সেতু রক্ষায় ক্ষোভ ঝাড়েন ফেবু ব্যবহারকারী স্হানীয় বাসিন্দা।
আরেক ফেবু ব্যবহারকারী জামিল আহমেদ জামিল তার আইডিতে লিখেন-“ভাই ধলাই ব্রীজ রক্ষায় আন্দোলন করলেন! আন্দোলন প্রতিহত করলেন,তীব্র সমালোচনা করে রাস্তাঘাট গরম রাখলেন!
এখন যখন সব আন্দোলন প্রতিবাদকারী থেমে গেলেন তো আপনিও চুপ হয়ে গেলেন! কবিতার সুরে তিনি ক্ষোভ ঝাড়েন,
“চুপ মানি চুপ একেবারেই চুপ!
লুটেরারা খাাবলে খাচ্ছে হামলে পরে!
মাদকে সয়লাব আর ধলাই ব্রীজ বিলীনের পথে!
স্হানীয় ব্রীজ রক্ষা আন্দোলন কমিটির পক্ষে এলাকাবাসী লুটপাটের চিত্র উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করলে তাৎক্ষণিক অভিযানের খবর চাউর হয়ে যায় কোন এক অদৃশ্য যোগসাজশে। তবুও নয়া উপজেলা প্রশাসন টাস্কফোর্স মাধ্যমে চলমান ১৫ দিনে অন্তত ১০ টি অভিযানে ২০/২২ জন ব্যক্তি ছোটবড় ১৫ টির মতো ষ্টীলবডি ও নৌকা আটকসহ জেল জরিমানা দেন। এতোসব অভিযানেও থামানো যাচ্ছেনা বালু খেকোদের দৌরাত্ম একদিকে অভিযান শেষ হওয়ার ঘন্টা দুয়েক পরেই ফের শুরু বালু তুলার হিড়িক। এ যেনো সেতু এলাকার বালু খেকো ও উপজেলা প্রশাসনের যুদ্ধাবস্থার শামিল।
এলাকাবাসী তথা ব্রীজ রক্ষা আন্দোলন কমিটির পক্ষে কয়েকজন দাবী করেন সেতুটি হুমকীর সম্মুখীন হতে বাঁচাতে জেলা, উপজেলা প্রশাসন কতৃক নির্ধারিত সেতু হতে ৫০০ মিটার দূরত্ব সীমানা আনুষ্ঠানিক চিহ্নিতকরণ জরুরি। এতে এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন সমন্বয় করে আনুষ্ঠানিক সীমানা পিলার ফ্লাগ স্হাপন ও স্হায়ী পুলিশ টহল না হলে এর গুরুত্ব ও বালুখেকোদের পেশীশক্তিকে দমানো সম্ভব হবেনা।
এদিকে সেতু সংলগ্ন তীরবর্তী কলাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা ফয়জুল হক নামের এক ব্যক্তি তার বাড়ীঘরের পাশে বালু উত্তোলন এর ফলে নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে অভিযোগ দায়ের করেছেন উপজেলা প্রশাসন বরাবর। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন কয়েকদিন ধরে পার্শবর্তী বালু বিক্রয়কারী একটি গ্রুপ কোটি টাকার বিনিময়ে দখলীয় খাস জমি মূল বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট এর কাছে বিক্রি করে। এতে পার্শবর্তী দখলীকৃত স্হানে অভিযোগকারীর বাড়ীঘর বিদ্যমান। এমতাবস্থায় গভীর রাতে জোরপূর্বক আবেদনকারীর বাড়ীর পাশ হতে বালু তোলায় হুমকীর সম্মুখীন এতে নিষেধ বাধা দিলে বালু উত্তোলনকারী দল হুমকী দেয়। যা কে বা কারা আবেদনটিতে নাম ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে বলে আবেদনে দেখা যায়। ভুক্তভোগী ফয়জুল প্রশাসন কতৃক সকল নিরাপত্তার বিষয়ে সহায়তা কামনা করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভোলাগঞ্জ, ডাকঘর,নোয়াগাংগের পার,পাড়ুয়া ডাকঘর এলাকার কয়েকটি গ্রুপে সেতু এলাকায় দখলীকৃত অজুহাতে মূল বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেটের কাছে স্বল্পমূল্যে দিন রাত বালু উত্তোলনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। এতে সেতুসহ নদী তীরের এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি সাধিত যা ভবিষ্যৎ সংকট চরমে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রশাসনের স্হায়ী নজরদারি বাড়ানোর দাবীও জানাচ্ছেন ব্রীজ রক্ষা আন্দোলন কমিটির নেতৃবৃন্দসহ উপজেলার সুশীল সমাজ।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রবিন মিয়া প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বলেন, ধলাই সেতু রক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া, প্রতিনিয়ত অভিযান চলমান সেতুর পাশে বালু উত্তোলব কারীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনী মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে এবং শীঘ্রই গুরুত্বপূর্ণ ধলাই সেতু রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন এর পক্ষ হতে স্হায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানোর প্রক্রিয়া চলমান।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মোঃ রতন শেখ জানান, সেতু রক্ষায় এলাকাবাসীর দূর্বলতাকে দায়ী করেন, তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন স্হানীয় ৯৫ ভাগ বাসিন্দা অর্থলোভে বালু লুটপাটের সাথে জড়িত, তাদের আস্কারায়ই শতশত নৌকা, ষ্টীলবডি গভীর রাতে হুলিখেলায় থাকে মত্ত!তিনি সার্বক্ষণিক পুলিশী নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন তবে সামাজিক আন্দোলন এলাকাবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন।
প্রসঙ্গত, ধলাই সেতু সিলেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতুটি ২০০৪-০৬ অর্থ বছরে তৎকালীন চারদলীয়জোট সরকারের আমলে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান এর একান্ত প্রচেষ্টার ফলে পূর্ব ধলাইর দুটি ইউনিয়ন এর লক্ষাধীক মানুষের প্রাণের দাবী বাস্তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে দেন চলাচলের জন্য। ফলে এখন ব্যবসা,যাতায়াত,সহ সবমিলিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেতুটি রক্ষা।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd