সিলেট ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১১ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০১৯
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া,সুনামগঞ্জ :: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ১৪বছর পূর্ণ হলেও পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পায় নি ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা। টেংরাটিলাবাসী ১৪বছর পরও ক্ষতিপূরণ পায় নি। আজ সেই ৭জানুয়ারী ২০০৫সাল। এই তারিখে টেংরাটিলার গ্যাসফিল্ডের প্রোডাকশন ক‚পের রিগ ভেঙ্গে বিস্ফোরণ হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আশ পাশের টেংরাটিলা,আজবপুর,গিরিশনগর,কৈয়াজুড়ি,টেংরাবাজার এবং শান্তিপুরের মানুষের ঘরবাড়ি,গাছগাছালি ও হাওরের ফসলি জমি। অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্যাস বের হওয়ার ফলে তাদের কৃষি, মাছচাষ, স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। এ বিস্ফোরণের ঘটনার ক্ষত চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন টেংরাটিলার মানুষ।
জানাযায়,গত ২০০৫সালের ৭জানুয়ারি রাত সাড়ে ৩টার দিকে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে প্রথম অঘটন ঘটে। গ্যাসফিল্ডের প্রোডাকশন ক‚পের রিগ ভেঙ্গে আগুন ২০০থেকে ৩০০ফুট ওঠানামা করেছিল। পরে এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলার পর আপনা-আপনি নিভে যায় আগুন। একই বছরের ২৩জুন রাত ২টায় দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ক‚প এলাকার তিন কিলোমিটার দ‚রেও ভ‚-ক¤পন অনুভ‚ত হয়। প্রথম দফায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলে ১০কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দুই দফা অগ্নিকান্ডে গ্যাসফিল্ডের ধ্বংস হয়ে যায় ৫দশমিক ৮৯থেকে কমপক্ষে ৫২বিলিয়ন কিউসেক রিজার্ভ গ্যাস। অগ্নিকাÐে ক্ষতিগ্রস্ত হয় টেংরাটিলা,আজবপুর,গিরিশনগর,ইসলামপুর,ভুজনা, আলীপুর,শান্তিপুরসহ ১০টি গ্রামের মানুষ। এতে তিন হাজার একর ফলের বাগান,শতাধিক পুকুরের মাছ,সবজি বাগান নষ্ট হয়ে যায়। গ্যাসফিল্ডের আশপাশের গ্রামবাসী শ্বাসকষ্ট,হৃদরোগ,চর্মরোগ,আর্সেনিকসহ বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে ভুগছেন। এখনও গ্যাসফিল্ড সংলগ্ন এলাকায় দু-একটি জলাশয়ে গ্যাস বের হচ্ছে।
সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে,২০১৬সালের অগাস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী,টেংরাটিলার আশেপাশে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ৪৫জন,হৃদরোগে ২২জন,চর্মরোগে ৩৬জনসহ অন্যান্য রোগে ২২জনসহ মোট ১২৯জন আক্রান্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বেশি। গ্যাসফিল্ডের আশেপাশের গ্রামের লোকজনের স্বাস্থ্য সমস্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকার আর্ন্তজাতিক আদালতে ক্ষতিপ‚রণ মামলা করেছে। বর্তমানে আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলাটি বিচারধীন রয়েছে।
আশিষ রহমান,রহিম মিয়া,টিটু,রমজান আলীসহ স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান,টেংরাটিলার আশপাশের গ্রামের ফাটল দিয়ে গ্যাস উদগীরণ শুরু হয়,যা আজও অব্যাহত আছে। এর প্রভাবে এলাকার জীব-বৈচিত্র ক্রমেই বিনষ্ট হচ্ছে এবং বাসিন্দারা শ্বাসকষ্টজনিত বিভিন্ন জটিল রোগে ভোগছেন। টিউবওয়েলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক থাকায় পানি ব্যবহার করায় হাত খসখসে হয়ে গেছে,মাথার চুল পড়ে যায়। পানি দিয়ে কাপড়চোপর ধুলে রং বদলে যায়। অনেকেই আর্সেনিকে ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন আক্রান্ত হয়েছেন। তারা বর্তমানে কোনও কাজকর্ম করতে পারেন না। বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েছেন কিন্তু ভালো হয় নি।
সাদরুল আমিন জানান,এই গ্যাসফিল্ডের টেংরাটিলা,আজবপুর,কৈয়াজুড়ি,শান্তিপুর ও গিরিশ নগরের অনেক পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণ পায় নি। কানাডিয়ান কো¤পানি নাইকো অগ্নিকান্ডের পর সিঙ্গাপুর থেকে বীমার টাকা আদায় করে নিয়ে তারা পর্যায়ক্রমে টেংরাটিলা থেকে চলে যায়। বছর দু’য়েক আগে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড পরিদর্শনে আসেন তৎকালীন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তার সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা আসলে টেংরাটিলা স¤পর্কে আর কোন আপডেট সরকারি ভাবে জানানো হয় নি।
টেংরাটিলা দাবি আদায় সংগ্রাম পরিষদ সিলেটের সভাপতি নুরুল আমিন বলেন,খননকারী প্রতিষ্ঠান কানাডিয়ান কো¤পানি নাইকো যে ক্ষতি করেছে তা কোনো দিন প‚রণ হবে না। টেংরাটিলায় এখনও যত্রতত্র গ্যাসের বুদবুদ উঠছে। বর্ষার মৌসুমে তা দৃশ্যমান হয় ১কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে পরপর দু’দফা ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে।
টেংরাটিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, অগ্নিকাÐের প্রভাব এখনও গ্যাসফিল্ডের আশপাশের এলাকায় কোনও গাছ জন্মায় না ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। কোনও গাছের চারা লাগানো হলে বছর খানেক জীবিত থাকে পরে আবার মরে যায়। অগ্নিকাÐে পশুপাখিরও ক্ষতি সাধিত হয়। এখানে কোন ফসল হয় না। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে গ্যাস উদগীরনের ফলে লোকজন অসুস্থ হচ্ছে।
সুনাামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডাঃ বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে অনিয়ন্ত্রিত এভাবে গ্যাস বের হলে গ্যাসফিল্ড এলাকার মানুষের চোখে ঝাপসা দেখা,শ্বাসকষ্ট,চর্মরোগ হতে পারে এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপ‚র্ণ।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন,বর্তমানে গ্যাসফিল্ড এলাকায় যেন কোনও ধরনের দূর্ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে সজাগ রয়েছে প্রশাসন। তৎকালিন সময়ে অগ্নিকাÐের পর এখন সেখানে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd