এত মেধাবী হয়েও অপরাধীচক্রে ওঁরা

প্রকাশিত: ২:০৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২০

এত মেধাবী হয়েও অপরাধীচক্রে ওঁরা

Manual6 Ad Code

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ রিমান্ডে আছেন অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী শারমিন জাহান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার। পিএইচডি করছেন চীনের উহানে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন আরেক নারী রাহাত আরা খানম ওরফে ফারজানা মহিউদ্দিন ওরফে তূর্ণা আহসান। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে গত সপ্তাহে ১২ নাইজেরিয়ানের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন এই তরুণী।

করোনা পরীক্ষায় জালিয়াতির আলোচিত মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিটের রেজিস্ট্রার ডা. সাবরিনা চৌধুরী। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও স্বামী আরিফ চৌধুরীর জেকেজি হেলথকেয়ার, যা জালিয়াতিতে জড়িত বলে অভিযোগ, তার আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক আরো কিছু আলোচিত ঘটনার তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, করোনাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ব্যবহার করে জালিয়াতি ঘটছে। দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রলোভনে মেধাবী ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও কতিপয় নারী অপরাধী চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শারমিন জাহান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। স্নাতকোত্তর শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার পদে যোগ দেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের গত কমিটিতে তিনি মহিলা ও শিশু বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য পদে ছিলেন। এর আগের কমিটিতে একই উপকমিটির সহসম্পাদক ছিলেন শারমিন, যদিও এখন কোনো পদে নেই।

Manual8 Ad Code

জানা গেছে, শারমিন জাহান ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি গবেষণার জন্য শিক্ষা ছুটি নিয়ে চীনের উহানে যান। সেখানে থাকতেই ব্যবসা শুরু করেন তিনি। গত ডিসেম্বরে করোনার কারণে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণা এখনো শেষ হয়নি। তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা করছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শারমিন মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানে থাকলেও রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য নকল মাস্ক সরবরাহের কারবার শুরু করেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রলোভনে সাড়া দিয়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে করছিলেন এই কারবার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এটার মালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা পদে চাকরিরত একজন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। তাঁর অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ফরমাল কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা ব্যবসা করার সুযোগ নেই।’

তূর্ণা আহসান নামে ফেসবুক আইডিতে তিনি ‘বিজয়লক্ষ্মী নারী’ গ্রুপ চালাতেন। টেলিভিশন টক শোতেও উপস্থিত হয়েছেন অনেকবার। ফেসবুকে বন্ধু হয়ে উপহার পাঠানোর নামে প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। কাস্টমস কমিশনার হিসেবে পরিচয় দিয়ে টাকা আদায় করতেন রাহাত আরা।

অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন, ছদ্মনামে ফেসবুকে নিজেকে উপস্থাপনের মাধ্যমে অল্প সময়ে অঢেল টাকার মালিক হতে অপরাধী চক্রটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন রাহাত আরা।

Manual6 Ad Code

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, রাহাত আরা খানম ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন অ্যান্ড লাইব্রেরি সায়েন্সে পড়ালেখা শেষে চাকরি খুঁজছিলেন। ওই সময় নাইজেরিয়ান চক্রটি অফিস খুলে লোক নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। তিনি সেখানে চাকরি নেন। এই চক্র ফেসবুকে বন্ধুত্বের পর দামি উপহার পাঠানোর নামে প্রতারণা করে গত দুই মাসে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

Manual1 Ad Code

গত ২১ জুলাই পল্লবী বেনারসি পল্লীর ওই ছয়তলা ভবনে অভিযান চালিয়ে রাহাত আরাসহ ১২ নাইজেরিয়ানকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। ভবনের দ্বিতীয় তলায় তাদের অফিস। চতুর্থ তলায় থাকত বিদেশিরা আর ষষ্ঠ তলায় থাকতেন রাহাত আরা খানম। চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে বন্ধুত্বের একপর্যায়ে কাস্টমস কমিশনারের পরিচয়ে রাহাত আরা খানমকে দিয়ে ফোন করানো হতো।

Manual1 Ad Code

গত বুধবার রাহাত আরার মতো একই রকম প্রতারক দুই নাইজেরিয়ানের সঙ্গে ধরা পড়েন নূপুর খাতুন নামে আরেক তরুণী। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, নূপুরও কাস্টমস কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা করছিলেন। তাঁর ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

গত ২৩ জুন জেকেজি হেলথকেয়ারে অভিযান চালিয়ে পুলিশ প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী আরিফ চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী সাবরিনার নাম উঠে আসে। গত ১২ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর দুই দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিটের রেজিস্ট্রার। তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জেকেজি হেলথকেয়ার ১৫ হাজার ৪৬০ জনের করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে।

পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, তদন্তে জেকেজির আহ্বায়ক হিসেবে ডা. সাবরিনা চৌধুরী সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ডিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, মেধাবী চিকিৎসক সাবরিনা মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচিত মেধাবী মুখ ছিলেন। কিন্তু দ্রুততম সময়ের মধ্যে টাকা আয়ের জন্য তিনি করোনা পরীক্ষা জালিয়াতিতে সহায়তা করেন। সহযোগীরা সাবরিনাকে ব্যবহার করে অপকর্ম চালান।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..