সিলেট ১২ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৫শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২০
সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা :: চতুর্থ দফা বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় গোয়াইনঘাট উপজেলায় জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এবারের ভয়াবহ বন্যায় মানুষ ও পশুপাখির ভয়াবহ দুর্গতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের রোগবালাই দেখা যায়। এর মধ্যে পানি ও কীটপতঙ্গবাহিত রোগের সংখ্যাই বেশি। বন্যার সময় ময়লা-আবর্জনা, মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্র এবং পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা একাকার হয়ে এসব উৎস থেকে জীবাণু বন্যার পানিতে মিশে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে বন্যায় সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার বেড়ে যায়।
বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষের ক্ষেত্রে জ্বর-সর্দি, ডায়রিয়া, কলেরা, রক্ত আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, ভাইরাল হেপাটাইটিস, পেটের পীড়া, কৃমির সংক্রমণ, চর্মরোগ, চোখের অসুখ প্রভৃতি সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের যেসব রোগ হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি রোগ আসে পশুপাখি থেকে। বাড়ির পোষা বিড়াল ও কুকুরও রোগ ছড়াতে পারে। ইঁদুর ও গবাদিপশুর মূত্র থেকে লেপটোস্পাইরোসিস এবং বিড়ালের পায়খানা থেকে টক্সোপ্লাজমোসিস হয়, যা গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটায়। কুকুর ও ইঁদুরের কামড়ে জলাতঙ্ক হতে পারে। পানি ও কাদার সংস্পর্শে হাতে ও পায়ের চামড়ায় চুলকানি ও ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দেয়। বন্যা-পরবর্তী সময়ে কীটপতঙ্গের আধিক্য দেখা যায়। ফলে এসব কীটপতঙ্গ দ্বারা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়া হতে পারে।
বন্যার সময় গবাদিপশুর সাধারণত আঘাতজনিত ক্ষত হয়, যেখানে মাছি বসে চর্মরোগ সৃষ্টি করে। এতে গরুর পানিশূন্যতা দেখা যায় এবং গরু পানি খেতে চায় না। এ ছাড়া গরুর খুরারোগ, গলাফোলা রোগ, তড়কা, বাদলা, লেপটোস্পাইরোসিস; হাঁস-মুরগির রানীক্ষেত এবং ছাগলের পিপিআর রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। পরজীবী বা কৃমির আক্রমণ বেড়ে যায়। ভেড়ার লোম দীর্ঘক্ষণ ভেজা থাকায় চামড়ায় ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গবাদিপশুর খাবারে ছত্রাক জন্মে খাবারের পুষ্টিমান ও স্বাদ কমিয়ে দেয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গো-খাদ্যকে বিষাক্ত করে ফেলে, যা খেয়ে পশুর যকৃৎ নষ্ট হয়ে যায়। পানি ও কাদার সংস্পর্শে গবাদিপশুর পায়ে ক্ষত ও ফোড়া হয়। আর্দ্র পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া বেশি জন্মানোর কারণে গবাদিপশুর নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া হতে পারে।
পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে অবশ্যই সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে এবং সব কাজে নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বন্যার পানি বা বন্যায় তলিয়ে যাওয়া নলকূপ, কুয়া বা অন্য কোনো উৎসের পানি জীবাণু দ্বারা দূষিত থাকায় কোনো অবস্থাতেই এসব পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া, কুলি করা বা পান করা যাবে না। বন্যার পানিতে গোসল করা, কাপড়চোপড় ধোয়া, থালাবাসন পরিষ্কার করা চলবে না। যতটা সম্ভব বন্যার পানি এড়িয়ে চলতে হবে। গবাদিপশুর ক্ষেত্রেও এসব পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বন্যার পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করা উত্তম। এ ক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার পাত্রে পানি সংগ্রহ করে প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য রেখে দিতে হবে। তলানি পড়লে ওপরের পরিষ্কার পানি আলাদা পাত্রে ঢেলে নিয়ে ফোটাতে হবে। তবে জ্বালানির সংকট থাকলে বা ফোটানো সম্ভব না হলে ক্লোরিনের মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধ করা যায়। এ ক্ষেত্রে এক গ্যালন পানিতে এক কাপের চতুর্থাংশ ব্লিচিং পাউডার (বা ফিটকিরি ভালোভাবে মেশানোর পর ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।
এ ছাড়া ট্যাবলেটের মাধ্যমেও পানি বিশুদ্ধ করা যায়। এক লিটার পানিতে চার মিলিগ্রাম হ্যালোজেন ট্যাবলেট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রাখলে পানি বিশুদ্ধ হবে। তবে এতে অন্যান্য জীবাণু মরলেও অনেক ভাইরাস-জাতীয় জীবাণু মরে না। একমাত্র ফোটানোর ফলে ভাইরাস জীবাণু ধ্বংস হয়।
অনেক মৃত প্রাণী পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশকে দূষিত করে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। মৃতদেহ মাটির তিন মিটার নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। খালি হাতে মৃতদেহ ধরা যাবে না। মানুষ ও গবাদি পশুপাখির মলমূত্র নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে। মলমূত্র ত্যাগের জন্য অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা করা যেতে পারে। বন্যার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও ফিটকিরি, মশার কয়েল, স্যালাইন, সাবান, ডেটল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরকারি ও বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা প্রয়োজন। এ জন্য প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে জনসচেতনতার পাশাপাশি মানুষ ও ভেটেরিনারি স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা প্রদান করা প্রয়োজন।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd