সিলেট ২৬শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৬ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ১১:৪৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০১৮
জাবেদ এমরান :: বৃত্তাকার লোকের জটলা। ভেতর থেকে মাইক্রোফোনে গলার স্বর ভেসে আসছে। ভিড়ের মধ্যে উঁকি মেরে দেখা গেল মধ্যবয়সী একজন লোক নানা অঙ্গভঙ্গিতে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসার কথা বলে যাচ্ছেন। তাকে সাহায্য করছে একজন সহযোগী। সামনে সাজানো বিভিন্ন রকম গাছের বাকল, শেকড়, ফল ও কিছু প্রাণীর অঙ্গবিশেষ। লোকজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনছেন। যাদের বেশিরভাগই নিম্ন ও দরিদ্রশেণীর মানুষ। এরকম দৃশ্য প্রতিদিন চোখে পড়ে সিলেট আদালত পাড়ায় ও নগরের ফুটপাতে। শুধু নগরীতে নয় জেলার হাট-বাজারে, বাসে, রেলে, লঞ্চে ও উন্মুক্ত স্থানে চোখে পড়ে। তারা কেউ কবিরাজ, হেকিম, সর্পরাজ, ডেন্টিস্ট ও ডাক্তার নামে চিকিৎসা করে চলছেন। সাপ-বেজীর খেলা, কেউ জাদু দেখিয়ে কেউবা আবার বিভিন্ন চটকদারি কথাবার্তায় ও ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত কথা বলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অভিযোগ আছে কবিরাজ বা ডাক্তার দাবি করলেও এসব লোকের বেশিরভাগেরই কবিরাজি বা ডাক্তারি শাস্ত্রে নেই কোন জ্ঞান। এদের দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রতারিত হচ্ছেন নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া রোগীরা। সহজসরল ও দরিদ্রশেণীর মানুষদের টার্গেট করে স্বল্প খরচে বিভিন্ন চিকিৎসার নামে ভূঁইফুর কবিরাজরা মানুষকে সর্ব শান্ত করলেও দেখার কেউ নেই। ফুটপাথে প্রকাশ্যে দাঁত ওঠানো-লাগানো, বাঁতের ব্যথা, টিউমার, প্যারালাইসিস, ডাইবেটিস, হাঁপানি, অর্শ, গেজ, পাইলস, কাশি, আমাশয়, ওজন, মেদ বা চর্বি কমানো, স্লিম হওয়ার উপায়, জন্ডিস, গ্যাস্টিক, সিফিলিস, ক্যান্সার, স্থায়ীভাবে মোটা হওয়া, চর্ম ও যৌনরোগ ছাড়াও অন্যান্য পুরাতন জটিল রোগ গ্যারান্টিসহ চিকিৎসা করে হচ্ছেন। মুহুর্তের মাঝে ঔষধের ফলাফল, বিফলে মূল্য ফেরত এবং ঔষধ সেবনের পরে কাজ হলে মসজিদ-মন্দিরে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সর্ব রোগের ওষুধ ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে। নকল ও ভেজাল এসব ঔষধ ১০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা দামের বিক্রি হয়। নগরীর ফুটপাত দখল করে মাইকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, মিউজিক বাজিয়ে বীরদর্পে বিক্রি করা হচ্ছে সর্ব রোগের মহৌষধ। কোম্পানীর প্রচারের জন্য বলে, আবার কখনও বিভিন্ন কোম্পানীর প্রতিনিধি, কখনও কখনও নানা ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে দেদারছে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি হচ্ছে ফুটপাত কিংবা সড়কের দ্বারে। যারা এ সর্ব রোগের ঔষধ বিক্রি করছেন তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে পুলিশ ও হকার্স নেতৃবৃন্দ। জজকোর্টের সামনে অবস্থান করে দেয়া যায়, কবিরাজ রোগীকে দেখেই বলে দিচ্ছেন একের পর এক রোগের নাম ও রোগীর নাম ঠিকানা। অনুসন্ধান জানা যায়, জমায়েত মানুষের মধ্য থেকে যার নাম ঠিকানা ও রোগের নাম বলা হয় সে তাদেরই লোক। উপস্থিত মানুষের বিশ্বাস কবিরাজের উপর জন্ম দিয়ে ঔষধ বিক্রি করতে অভিনব প্রতারণার এমন আশ্রয়। সেখানে মজমা বসিয়ে দীর্ঘদিন থেকে জামাল, সেলিম, ছাহেদসহ কয়েকজন গ্রাম থেকে শহরে আসা সহজসরল মানুষদের ঠকাচ্ছে। এদিকে, মজমার আড়ালে পকেটমারের ব্যবসাও চালু আছে। শহরে জরুরী কাজে এসে অনেকে টাকা মোবাইল হারিয়ে কাজ না করেই ফিরে যাচ্ছেন বাড়ি। এমন অভিযোগ বিস্তর। কদমতলীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল রোডের ফুটপাতে সারি সারি দঁন্ত রোগের দোকান গড়ে উটেছে। ধুলোবালি আর ময়লা আবর্জনায় ঠাসা টেবিলে রাখা যন্ত্রপাতি। দাঁত ওঠাতে চেতনা নাশক কাজে ব্যবহার হচ্ছে এক সিরিঞ্জ বারবার আর মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ। দাঁত ওঠানো, ফিলিং করা, স্ক্যালিং ও ক্যাপ লাগানোসহ দাঁতের সব ধরনের চিকিৎসা হয় ফুটপাতে। দাঁতের চিকিৎসা করছিলেন অল্প শিক্ষিত এক যুবক। কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, একসময় তার বাবা দাঁতের চিকিৎসা করতেন। উত্তরাধিকার সূত্রেই এখন তিনি দাঁতের চিকিৎসক। টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো নানা ধরনের দাঁত। কোনোটি আসল, আবার কোনোটি নকল। তবে এগুলোর কোনোটিই ফেলনা নয়। এমনকি নষ্ট দাঁতটিও কাজে আসছে। একটি দাঁত ফিলিং করতে নেওয়া হয় ৫০ টাকা। ওঠাতে ২০/৫০ টাকা, স্ক্যালিং ১০০ টাকা। ক্যাপ ৫০ টাকা। ফুটপাতের চিকিৎসায় এক সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহারের ফলে জন্ডিসসহ মুখে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সূত্র জানায়, নগরীতে ফুটপাতে বসা এসব ভুয়া কবিরাজ, ডাক্তারের কাছ থেকে প্রতিদিন বন্দর বাজার ফাঁড়ি পুলিশের মনোনীত ব্যক্তিরা টাকা নেয়। দক্ষিণ সুরমায় টার্মিনাল ফাঁড়ির লাইনম্যান এক সময়কার রিকসা চালক কাজল ফুটপাতের টাকা তুলে ফাঁড়ি পুলিশকে দেয়। পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার কারনে প্রতারণার ব্যবসা দিনদিন বাড়ছে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়ার সাথে তার অফিসে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, পুলিশের কেউ জড়িত থাকলে আর তার প্রমান পেলে যথাযথা ব্যবস্থা নেয়া হবে।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd