ছাতকে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে অডিটোরিয়াম হচ্ছে না ব্যবহার

প্রকাশিত: ৪:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৫

ছাতকে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে অডিটোরিয়াম হচ্ছে না ব্যবহার

Manual4 Ad Code
নিজস্ব প্রতিবেদক, ছাতক :: সুনামগঞ্জের ছাতক পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কালাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির টেন্ডার,নি‌য়োগ বা‌নি‌জ্যেসহ নানা অভিযোগ উঠে‌ছে ।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিন মেয়াদে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী গ্রুপিং রাজনীতির মাধ্যমে অবৈধ টাকা আর পেশীশক্তির প্রভাব খাটিয়ে প্রয়াত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের প্রশ্রয়ে এলাকায় গড়ে তোলেন নিজস্ব বলয় বা‌হিনী। নিয়ন্ত্রণে ক‌রেন লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানি, সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল, ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, আকিজ প্লাস্টিক লিমিটেড। নৌপথে চাঁদাবাজিসহ নানা অরাজকতা। এতে তার সঙ্গী ভাই-ভাতিজা। বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা, ব্যবসায়ী সমিতি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পদগুলো ছিল তার পরিবার এবং সমর্থকদের দখলে।
কোম্পানিগুলোর স্থায়ী-অস্থায়ী জনবল নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য ছিল আবুল কালাম চৌধুরী ও তার ভাইদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রকৃত ঠিকাদাররা ছিলেন বঞ্চিত। আবুল কালাম চৌধুরী পৌর মেয়র থাকাকালেও লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানিতে কালাম অ্যান্ড কোং নামে শ্রমিক সরবরাহের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন।
ছাতক পৌর শহরে প্রায় ১৩ কোটি ২৯ লাখ ৮৭ হাজার ২০৭ টাকা ব্যয়ে নির্মিত অডিটোরিয়াম ভবনটি আজও কোনো কাজে আসছে না। কয়েক বছর আগে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এ ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও কার্যকর ব্যবহারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা এ স্থাপনাটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে ধীরে ধীরে অচল হয়ে যাচ্ছে।
দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা আয় করতে কারো পরামর্শ ছাড়াই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে পৌরসভার মূল ভবনের পাশে ঢাকার মিম ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং এর নামে ১৩ কোটি ২৯ লাখ ৮৭ হাজার ২০৭ টাকা ব্যয়ে নতুন একটি অডিটোরিয়াম ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২১ সা‌লে ২৮ ডি‌সেম্বর। ২০২২ সা‌লে ২৭ ডি‌সেম্বর কাজ মেয়াদ শেষ। দীঘ প্রায় তিন বছর ধ‌রেই অ‌তিবা‌হিত হ‌চ্ছে এখ‌নো ও ঠিকাদা‌রি প্রতিষ্টান অডিটোরিয়াম ভবন নির্মাণ হস্তান্তর করা হয়‌নি। সা‌বেক মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী এ ভবনে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকায় উন্নিত করে এডিপি খাতের টাকা খরচ দেখালেও এসব কোনো সঠিক নথিপত্র নেই পৌরসভায় কতৃপক্ষের কা‌ছে।
জানা যায়, ভবনের নির্মাণকাজের শুরুতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিম ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ করলেও কিছুদিন পর কাজে অনিয়মের অজুহাত দেখিয়ে সরকার দলীয় ক্ষমতার দাপট দে‌খি‌য়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে আবুল কালাম চৌধুরী নিজেই ঠিকাদারি কাজের তদারকি করে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এ প্রকল্প থেকে।
এখনো ভবনটির নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। শহরতলীর মাধবপুর এলাকায় রিসাইক্লিং এর মাধ্যমে ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং ইয়ার্ডের জন্য জমি ক্রয় ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণেও প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
পৌর কার্যালয়ের আশপাশে ও মাধবপুরস্থ বঙ্গবন্ধু সড়কের পাশে প্রায় শতকোটি টাকার জমি কিনেছেন আবুল কালাম চৌধুরী। নোয়ারাই ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামেও শতাধিক হেক্টর জমি কিনেছেন তিনি। ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের মাধবপুরস্থ এ কে ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনের মালিক আবুল কালাম চৌধুরী।
এছাড়া প্রায় সাত থেকে আট কোটি টাকার বালির স্তুপ রয়েছে সুরমা নদীর পাড়ে আবুল কালাম চৌধুরীর। প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায় তিন মেয়াদে প্রায় ২০ বছর ধরে মেয়রের দ্বায়িত্ব পালন করলেও চোখে পড়ার মতো কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি। পৌর শহরের রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, বিনোদন ও খেলার মাঠসহ কোনো ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নেই ছাতক পৌরসভায়।
পে‌ৗর শহরের ব‌্যবসা‌য়ি আফছার উদ্দিনও  শামছুল ইসলাম বাবুল সাধারণ মানুষ বলছেন, অডিটোরিয়াম নির্মাণের মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চা, সভা-সেমিনার, সামাজিক অনুষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ভবনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও অনুষ্ঠান, কোথাও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তো দূরের কথা—কোনো সামান্য সভাও হয়নি।
একজন স্থানীয় শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শ‌র্তে বলেন,“এত টাকা খরচ করে ভবন করা হলো, অথচ আমরা এর কোনো সুফল পাচ্ছি না। এভাবে পড়ে থাকলে তো সরকারি অর্থ অপচয়ই হবে।
অডিটোরিয়ামটির মূল ভবন বিশাল ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হলেও ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়—ফার্নিচার নেই, সাউন্ড সিস্টেম নেই, আলোকসজ্জা নেই। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেয়ালে পড়েছে, কোথাও কোথাও রঙ উঠে যাচ্ছে। কয়েকটি কক্ষ ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। ভবনটির সামনে ঝোপঝাড় জন্মে গেছে।
ছাতক পৌর শহরের এক ব্যবসায়ী বলেন,
“এমন সুন্দর একটি অবকাঠামো পড়ে থাকাটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য। ঠিকভাবে ব্যবহার হলে এখানে ব্যবসায়ী সম্মেলন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এমনকি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সভাও করা যেত।”
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এর তত্ত্বাবধানে অডিটোরিয়ামটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২১ সা‌লে ২৮ ডি‌সেম্বর। মেয়াদ হয় ২০২২ সা‌লে ২৭ ডি‌সেম্বর। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৩ কোটি ২৯ লাখ ৮৭ হাজার ২০৭ টাকা ১৩ কোটি বেশি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছাতক শহরে আধুনিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও জনসমাবেশের চাহিদা মেটাবে এ ভবন। কিন্তু সমাপ্তির পর ব্যবহার না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়ে।
ছাতক-দোয়ারাবাজার অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অডিটোরিয়ামের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, এই অডিটোরিয়াম সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র হবে। কিন্তু সেটি অকার্যকর পড়ে থাকায় তাঁরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।একজন নাট্যকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“আমরা স্থানীয় শিল্পীরা নাটক মঞ্চস্থ করার জায়গা পাই না। স্কুলের মাঠ বা খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান করতে হয়। অথচ কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা অডিটোরিয়ামটি তালাবদ্ধ।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। এর ব্যবহারের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ, ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং নিয়মিত বাজেটের প্রয়োজন। অথচ এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
একজন সামাজিক সংগঠক মন্তব্য করেন,
“এটা স্পষ্ট যে পরিকল্পনা না করেই ভবন তৈরি করা হয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবকাঠামোতে বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ছাতক অডিটোরিয়াম দ্রুত সচল করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক কার্যক্রমে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা না হলে এটি সরকারি অর্থের ভয়াবহ অপচয় হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে- ১৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত অডিটোরিয়াম ভবনটি ব্যবহার না হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সংস্কৃতি চর্চা ও জনকল্যাণমূলক কাজের পরিবর্তে ভবনটি এখন অযত্নে পড়ে রয়েছে। অবিলম্বে এটি সচল করার উদ্যোগ না নিলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যথার্থতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।
এব‌্যাপা‌রে পৌর নিবাহী কর্মকতা শরদিন্দু রায় জানান, এখ‌নো ও ঠিকাদার নির্মিত অডিটোরিয়াম ভবনটি কতৃপ‌ক্ষে সম‌জি‌য়ে দেয়‌নি।
ছাতকের পৌর প্রশাসক মোঃ ত‌রিকুল ইসলাম,
এসব ঘটনার সত‌্যতা নি‌শ্চিত ক‌রে ব‌লেন, ঠিকাদার এখন  নির্মিত অডিটোরিয়াম ভবনটি কাজ শেষ কর‌তে পা‌রে‌নি। ঠিকাদার আমা‌দের‌কে ভবনটি আজও সম‌জি‌য়ে দেয়‌নি। অয‌ত্নে প‌ড়ে আছে ভবন‌টি।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

September 2025
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..