কোম্পানীগঞ্জে পাথরকাণ্ডে অভিযুক্ত জীবন মেম্বারের বিরুদ্ধে এবার জলমহাল লুটের অভিযোগ

প্রকাশিত: ৭:৫৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

কোম্পানীগঞ্জে পাথরকাণ্ডে অভিযুক্ত জীবন মেম্বারের বিরুদ্ধে এবার জলমহাল লুটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে জলমহালের একটি বিল থেকে মাছ লুটের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ইউপি সদস্য ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। চক্রটি আগে থেকেই পাথর লুটের অভিযোগে আলোচনায় ছিল। এবার তাদের বিরুদ্ধে বিল দখল ও মাছ লুটের অভিযোগে মামলা হয়েছে।

উপজেলার ধলিয়া-কালিয়া জলমহালের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে ‘গুল বিল’ নামে পরিচিত। এই বিলের ২৯৮ একর জায়গা ১৪৩২ থেকে ১৪৩৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ইজারা পান উপজেলার কাঁঠালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও ধুলিয়া সাতবিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আমিনুর রহমান। এরপর তিনি বিলে রুই, কাতলা, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৭ লাখ টাকার মাছের পোনা ছাড়েন।

অভিযোগ রয়েছে, গত ২ এপ্রিল রাতে স্থানীয় ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন ওরফে জীবন মেম্বার ও তার ভাই ইকবাল হোসেন আরিফসহ তাদের সহযোগীরা বিল থেকে মাছ লুট করে নিয়ে যান। এতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ইজারাদার আমিনুর রহমান।

এ ঘটনায় থানায় মামলা না নেওয়ায় গত ১৩ এপ্রিল সিলেটের একটি আদালতে মামলা করেন আমিনুল ইসলাম। মামলায় জীবন মেম্বারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। দ্বিতীয় আসামি তার ভাই ইকবাল হোসেন আরিফ। এ ছাড়া আরও কয়েকজনকে সহযোগী হিসেবে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- জালাল মিয়া, আমির আলী, রহিজ আলী, জুনেদ আহমদ ও আলী মিয়া।

জীবন মেম্বার ও তার ভাই আরিফের বিরুদ্ধে গত বছরের আগস্টে আলোচিত পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথর লুটেরও অভিযোগ রয়েছে। দুজনের নাম দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) লুটেরা তালিকায় রয়েছে। ঘটনাটিকে তাই পাথর লুটচক্রের বিল লুট বলে অভিহিত হচ্ছে।

জীবন মেম্বার পশ্চিম ইসলামপুর ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার)। পাশাপাশি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে ছিলেন। সাদা পাথর লুটকাণ্ডে দুদকের তালিকায় নাম ওঠায় তিনি রাতারাতি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে বিএনপির প্রার্থিতার প্রচারে নেমেছিলেন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলায় এই দুজন জেলও খেটেছেন। দুই ভাইয়ের নানা কাণ্ড নিয়ে খবরের কাগজে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জীবন মেম্বার তার ইউপি সদস্য পদ থেকে সাময়িক বরখাস্তও হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তিনি স্বপদে বহাল হন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে ফিরে আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করছেন।

জলমহালের ইজারাদার আমিনুর রহমান বলেন, ‘ইজারা নেওয়ার পর থেকেই বাধার মুখে পড়তে হয়। মৎস্য চাষ করতে গেলে জীবন মেম্বার তার ভাই আরিফসহ তাদের লোকজন নিয়ে বাধা দেন। তারা বিলের একটি অংশে ডাল-কাঁটা বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাদের দেওয়া কাটার অংশে আমাকে না যাওয়ার জন্য হুমকি দেন।’

এসব বিষয় জানিয়ে গত বছর ১০ নভেম্বর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়ার কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান আমিনুর রহমান।

তিনি জানান, অভিযোগ শুনে ইউএনও পরদিন কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি বরাবর তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠান। কিন্তু জীবন মেম্বারের প্রভাবে পুলিশের ওসি ব্যবস্থা গ্রহণে সময়ক্ষেপণ করেন। এরপর তিনি জেলা প্রশাসকের কাছেও অভিযোগ দেন। সেখান থেকেও গত বছরের ২৭ নভেম্বর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয় কোম্পানীগঞ্জের ইউএনওকে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ইউএনও-ওসির কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাননি। এরপর গত ২ এপ্রিল রাতে জীবন মেম্বারের নেতৃত্বে বিলের বেশির ভাগ মাছ লুট করা হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জীবন মেম্বার। তিনি বলেন, ‘আমিনুর দুই মাস আগে মাছ ধরে এখন মিথ্যা অভিযোগ করছেন। ইজারাকৃত কোনো জায়গায় কাটা ফেলিনি, মাছও ধরিনি। তবে আমি এই জলমহালটি আরেকটি মৎসজীবী সমিতির মাধ্যমে ইজারা নিতে চেয়েছিলাম। তাই সে (ইজারাদার) আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ করছে।’

লুটের আগে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া। তবে বিল লুটের দায় পুলিশের বলে জানান তিনি। ইউএনও বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর থানার ওসিকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলি। আমাদের কাজ হচ্ছে ইজারদারকে জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া। আমি সেটা করেছি। এখন ইজারাদার তার জায়গা নিজে দখলে রাখবেন। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। এর সমাধান থানার মাধ্যমে করতে হবে।’

এদিকে গুল বিল লুটের দায় এড়াতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলাও এড়িয়ে চলছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুর রহমান খান। গত বৃহস্পতিবার সকালে তার মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভি করেননি। দুপুরের দিকে কথা বলার বিষয়টি নিয়ে ওসির ফোনে ম্যাসেজ পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। শেষে বিকেলে আবার ফোন দিলে অন্য একজন পুলিশ সদস্য রিসিভ করে বলেন, ‘স্যার (ওসি) মোবাইল আমার কাছে রেখে গেছেন।’

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

April 2026
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

সর্বশেষ খবর

………………………..