সুলতান সুমন :: ৩০ ডিসেম্বর সম্পন্ন হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন শেষ হলেও এখনও নাশকতা আর সহিংসতার শঙ্কা কাটেনি নগর জুড়ে। ফলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। তাছাড়া নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়েও রাখা হয়েছে তল্লাশী চৌকি। আগামী ১৫ জানুয়ারী পর্যন্ত বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার থাকবে বলে জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র। সূত্র আরো জানায়, নির্বাচনের দিন বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ৬টি থানায় ২৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে আসামী করা হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের সহ¯্রাধিক নেতাকর্মীকে। এসকল মামলায় বেশির ভাগেই বাদী হয়েছেন পুলিশ। তাছাড়া কয়েকটিতে বাদী হয়েছেন সাধারণ জনতা। ফলে নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেও এখনো আত্মগোপনে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। সূত্র জানায়, ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সিলেট-১ আসনের ৪টি থানা ও সিলেট তিন আসনের ২টি থানার বিভিন্ন কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাংচুর, পুলিশের উপর হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এসকল ঘটনায় ২৪ টি মামলা দাখিল করা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে, সিলেট মহানগর পুলিশের দক্ষিণ সুরমা থানায় ৫ টি, মোগলাবাজার থানায় ৫ টি। সিলেট-৩ আসনের অর্ন্তগত এই দুইটি থানার ১০ টি মামলারই বাদী হয়েছেন পুলিশ। এমনটিই জানিয়েছেন, দক্ষিণ সুরমা ও মোগলাবাজার থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খায়রুল ফজল ও মো. আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। সিলেট-১ আসনের অর্ন্তগত মেট্রোপলিটন পুলিশের ৪ টি থানা ও দক্ষিণ সুরমায় অবস্থিত সিসিক’র ৩ টি ওয়ার্ড। এই ৪ টি থানায় দাখিল করা হয় ১৪ টি মামলা। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে এসএমপি’র জালালাবাদ থানায় ৬টি, শাহপরাণ (রহ.) থানায় ৪ টি, বিমানবন্দর থানায় ৩ টি ও কোতয়ালী থানায় ১ টি মামলা দাখিল করা হয়। এসকল মামলার মধ্যে শাহপরাণ (রহ.) থানার ৩ ও কোতয়ালী থানার ১টির বাদী হয়েছেন সাধারণ জনতা। এদিকে, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যাতে করে নগরীতে কোন ধরণের বিশৃংঙ্খলা বা নাশকতার ঘটনা না ঘটে । সেজন্য সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়, আদালত প্রাঙ্গন, সিলেট সার্কিট হাউজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিদ্যালয় সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আর নগরীর টিলাগড় পয়েন্ট, মদিনা মার্কেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা বা তল্লাশী চৌকি। এসকল স্থানে আগামী ১৫ জানুয়ারী পর্যন্ত নিরাপত্তা জোরদার থাকবে। মোগলাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, এসএমপি’র মোগলাবজার থানার সিলামে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হন এসএমপির উপ পুলিশ কমিশনার । সিলাম পদ্মলোচন বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংর্ঘষের ঘটনা ঘটে। ঘন্টাব্যাপি সংর্ঘষের সময় পুলিশ-বিজিবি সদস্যরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সংর্ঘষে আহত হন মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ওহাব মিয়া। ঐ কেন্দ্রে পুলিশ ও নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত দুইটি লেগুনাতে আগুন দেয়া হয়। এ সময় পোলিং এজেন্টের দ্বায়িত্বে থাকা দুইজন কর্মকর্তার দুটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ সংর্ঘষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও বিজিবি মিলে অর্ধশত রাউন্ড গুলি ছুড়ে। মোগলাবাজারে সরিষপুর ভোট কেন্দ্রেও নৌকা ও ধানের শীষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় আহত হন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার যুবলীগের সাবেক যুন্ম আহবায়ক ও মোগলাবাজার ইউনিয়ন ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোঃ আইয়ুব হোসেন সহ ৪০ জন। তাছাড়া জালালপুর ইউনিয়ন ও মোগলাবাজার থানার বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে সংর্ঘষের কারণে ৫ টি মামলা দাখিল করা হয়। এসএমপি’র শাহপরাণ (রহ.) থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আখতার হোসেন জানান, যেসব কেন্দ্রে পুলিশকে গুলি ছুঁড়তে হয়েছে এবং জানমালের ক্ষতি সাধন হয়েছে-এমন কেন্দ্র চিহ্নিত করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে ৩টিতে পাবলিক ও ১ টি পুলিশ বাদী হয়েছে। নগরীর কতোয়ালী থানার ওসি মোঃ সেলিম মিঞা জানান, তার থানায় কাজলশাহ এলাকার রাধারানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকার এজেন্ট ওয়াজিবুর রহমানের বাসায় হামলার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৫৮, কাজলশাহ এর বাসিন্দা ওয়াজিবুর রহমান বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেছেন। ওয়াজিবুর রহমান জানান, বিএনপি জামায়াতের লোকজন তার বাসা বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় কতোয়ালী থানায় মামলা করেছেন। এজাহারে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কতোয়ালী থানায় একটিমাত্র মামলাই দায়ের হয়েছে। অন্যদিকে, নগরীর জালালাবাদ থানায় ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জালালাবাদ থানার ওসি শাহ মোঃ হারুনুর রশীদ জানান, ৬টি কেন্দ্রে সহিংস কর্মকান্ড চালিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন। এই ৬টি কেন্দ্রকে চিহ্নিত করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৬টি মামলার মধ্যে পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন বাদী হয়েছেন। প্রত্যেক মামলায় গড়ে ৪০/৫০ জন করে আসামী করা হয়েছে। এ সব মামলায় বিএনপি নেতা শাহ জামাল নুরুল হুদা, ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শহীদ আহমদ, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আলতাফ হোসেন সুমনসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি তৃণমূল নেতা-কর্মীকে আসামী করা হয়েছে। নির্বাচনী সহিংসতায় এয়ারপোর্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। থানার ওসি এস এম শাহাদাত হোসেন জানান, মামলাগুলোতে পুলিশ বাদী হয়েছে। এতে শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়। সিলেট জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, নির্বাচনকে উপলক্ষ করে সিলেটের অনেক নেতাকর্মীকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। সে আতঙ্ক এখনও কাটেনি। শুধু যে রাজনীতি করেন-এমন নয় অনেক নেতাকর্মীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। তাদেরকেও আসামী করা হয়েছে। তাছাড়া গ্রামের একেবারেই নিরীহ ধানের শীষের সমর্থকদেরও মামলার আসামী করে হয়রানী করা হচ্ছে।