সিলেট ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২০
ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার তৃতীয় দিনের মতো উত্তাল ছিল রাজধানীসহ সারা দেশ। আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন, গণঅবস্থান, বিক্ষোভ-সমাবেশ ও কালো পতাকা মিছিল করেন। এসব কর্মসূচি থেকে তারা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান। আন্দোলনকারীদের নারী-পুরুষের একটি অন্তরঙ্গ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
এ ঘটনায় করা মামলায় এদিন আরও তিন আসামিকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে দুই মামলায় মাঈন উদ্দিন সাজুকে ৩ দিন করে ৬ দিন, আনোয়ার হোসেন সোহাগ ও নুর হোসেন রাসেলকে ২ দিন করে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এদিকে পর্নোগ্রাফি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় বুধবার এ তিন আসামির রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে নোয়াখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৩-এর বিচারক মাসফিকুল হক তাদের রিমান্ডের আদেশ দেন। এ তিনজনকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া বুধবার রাতে কুমিল্লা থেকে পলাতক আসামি আবুল কালাম আজাদকে (২৬) গ্রেফতার করেছে র্যাব। এ নিয়ে নয়জনকে গ্রেফতার করা হল। তাদের মধ্যে আটজনই এখন পুলিশ রিমান্ডে আছে।
এদিকে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। এগুলো গুরুতর অপরাধ এবং মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। নোয়াখালীর গৃহবধূকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও তার ভিডিও প্রকাশের ঘটনা সামাজিকভাবে নারীর প্রতি বিদ্বেষকে ফুটিয়ে তুলেছে বলে বুধবার জাতিসংঘের এক বিবৃতিতে মন্তব্য করা হয়। নোয়াখালীর ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে, এটি কোনো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে বিবৃতিটি প্রকাশ করেছেন। যারা বিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মিয়া সেপ্পো বলেন, জাতিসংঘ ন্যায়বিচারের দাবিতে সাধারণ জনগণ এবং সুশীল সমাজের পাশে দাঁড়াচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে অব্যাহত ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ নারীর প্রতি সহিসংতার মামলাগুলো দ্রুত বিচার আইনে করার জন্য সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে। সিলেট ও নোয়াখালীতে দুই নারীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে দেশে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ।
রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’, ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট’, ‘সেভ আওয়ার উইমেন’, ‘ধর্ষকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ও ‘টিম পজিটিভ বাংলাদেশ’সহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা অংশ নেন। নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে বরিশালে তরুণীরা সাইকেল র্যালি করেন। খুলনা ও রাজশাহীতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হয়। নোয়াখালীর কোনো আইনজীবী নির্যাতনকারীদের পক্ষে মামলায় দাঁড়াবেন না বলে ঘোষণা দেন। অনেক জায়গায় মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভে বক্তারা বলেন, ধর্ষকদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। ধর্ষক শুধুই ধর্ষক। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে দেশের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার ৩২ দিন পর রোববার দুপুরে গৃহবধূকে নির্যাতনের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ হলে তা ভাইরাল হয়- টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্থানীয় দেলোয়ার, বাদল, কালাম ও তাদের সহযোগীরা নির্যাতিত গৃহবধূর পরিবারকে কিছুদিন গৃহবন্দি করে রাখে। একপর্যায়ে তার পরিবারকে বসতবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পুরো ঘটনা দীর্ঘদিন স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ প্রশাসনের অগোচরে থাকে। বেগমগঞ্জ মডেল থানায় ৭-৮ জন অজ্ঞাতসহ ৯ জনের নামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক দুটি মামলা করেছেন নির্যাতিতা।
এছাড়া ভিডিও ভাইরালের ঘটনার মাস্টারমাইন্ড দেলোয়ার ও তার সহযোগী আবুল কালামের বিরুদ্ধেও বেগমগঞ্জ মডেল থানায় মঙ্গলবার রাতে ধর্ষণের মামলা করেন ওই নারী। এর আগেও দু’দফা ধর্ষণ করার অভিযোগে এ মামলা করেন তিনি। পাশাপাশি অস্ত্র ও ককটেল উদ্ধারের ঘটনায় দেলোয়ারের বিরুদ্ধে অস্ত্র এবং বিস্ফোরক আইনে আরও দুটি মামলা করেছে র্যাব। এ নিয়ে দেলোয়ার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধর্ষিতা গৃহবধূ বাদী হয়ে পর্নোগ্রাফি, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন আইনে ৩টি মামলা করেন।
নারায়ণগঞ্জ থেকে অস্ত্রসহ র্যাবের হাতে গ্রেফতার দেলোয়ারকে ১৩ অক্টোবর নোয়াখালীর বিচারিক আদালতে হাজির করা হবে বলে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান। দেলোয়ার বর্তমানে অস্ত্র মামলায় নারায়ণগঞ্জে পুলিশের রিমান্ডে আছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ থানার এসআই মোস্তাক আহমেদ জানান, বুধবার দুপুরে নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গ্রেফতার তিন আসামি সাজু, সোহাগ ও নুর হোসেন রাসেলকে হাজির করা হয়। ৩নং আমলি আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মাসফিকুল হক শুনানি শেষে দুটি পৃথক মামলায় সাজুর ৩ দিন করে ৬ দিন এবং পর্নোগ্রাফি মামলায় রাসেল ও সোহাগের ২ দিন করে মোট ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার রাতে ভিকটিম বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দেলোয়ার হোসেন দেলু ও আবুল কালামের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা করেন। বুধবার বিকালে নির্যাতিতাকে নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জ্যেষ্ঠ হাকিম নবনীতা গুহর আদালতে হাজির করা হয়। জ্যেষ্ঠ হাকিম ২২ ধারায় ওই নারীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ থানার এসআই মোস্তাক আহমেদ জানান, এজাহারভুক্ত পর্নোগ্রাফি ও ধর্ষণ মামলার আসামি ৪ জনসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত অন্যান্য আসামিসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, গ্রেফতার আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী এজাহারের বাইরেও ইউপি সদস্য মোয়াজ্জমসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করে পরে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধর্ষিতা নারীর জবানবন্দি অনুযায়ী স্থানীয় ইউপি সদস্য মোয়াজ্জম হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। ভিকটিম ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিষয়টি ইউপি সদস্যকে জানানোর পরও তিনি কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টি আদালতে ২২ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে স্পষ্ট হলে ইউপি সদস্য মোয়াজ্জমকে অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, রিমান্ডে আসামিরা ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে স্বীকার করার পরও তাদের কাছ থেকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি পাওয়া গেছে। স্পর্শকাতর মামলাটির অধিকতর তদন্তের স্বার্থে তা এ মুহূর্তে গণমাধ্যমে জানানো যাচ্ছে না। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে আরও যারা জড়িত, তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার শুরুতে ধর্ষিতার করা মামলায় বেগমগঞ্জে মামা বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে আসামি না করার বিষয়ে জানা যায়, ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার সময় ভয়ে এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে নির্যাতিতা দেলোয়ারের নাম উল্লেখ করেননি। ৬ অক্টোবর মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ-তদন্ত) আল মাহমুদ ফয়জুল কবির তাকে অভয় ও নিরাপত্তার কথাটি নিশ্চিত করলে দেলোয়ার কর্তৃক দু’বার ধর্ষণের বিষয়টি তাকে জানানো হয়। এরপর ওই দিনই দেলোয়ারের বিরুদ্ধে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় নির্যাতিতাকে পরপর দু’দিন ধর্ষণ করার বিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করা হয়।
বেগমগঞ্জের এখলাসপুরে অলিগলিতে প্রত্যন্ত এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, দেলোয়ার মামা বাহিনী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় থেকে এলাকায় বেআইনি অস্ত্রধারী বাহিনী, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ, খুন, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ছিনতাই, লুট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে আসছিল। স্থানীয় প্রশাসন জানলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd