সিলেট ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৮ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ৮:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক :: উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট বিভাগের কোটি মানুষের ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান ভূইয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরে হাসপাতালে এসেছে অনেক পরিবর্তন। বদলে গেছে সেবার চিত্র।
হয়রানি আর ভোগান্তির পরিবর্তে এখন রোগীদের মুখেই শোনা যায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রমের প্রশংসা। সেবার মানোন্নয়নের কারণে হেলথ সিস্টেম স্ট্রেনদেনিং স্কোরিংয়ে সারাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছে ওসমানী হাসপাতাল।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরিচালক হিসেবে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান ভূইয়া। যোগদানের পরই তিনি হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসাবান্ধব পরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদারের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।
এর অংশ হিসেবে তিনি গেল এক বছরে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শতভাগ বায়োমেট্রিক হাজিরা নিশ্চিত, দায়িত্বপালনকালীন সময়ে সবার নেমপ্লেট ও আইডি কার্ডসহ নির্ধারিত পোষাক পরিধান নিশ্চিতকরণ, দালাল নির্মূলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট দিন ও সময় ব্যতিত হাসপাতালে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রবেশ নিষেধ এবং রোগীর প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলা বন্ধ, হাসপাতালের ভেতর থেকে অবৈধ দোকানপাট ও হকার উচ্ছেদ এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ জোর দেন।
গেল এক বছরে পরিচালক হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের মানোন্নয়ন এবং চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে পরিচালক, উপ পরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের প্রতিদিন হাসপাতালে রাউন্ড নিশ্চিত করেন। আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মচারীরা আগে যেখানে তাদের ন্যায্য বেতন পাওয়া থেকে বঞ্চিত ছিলেন সেখানে পরিচালক উদ্যোগী হয়ে তাদের নিজ নিজ একাউন্টে বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন।
এতে আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে। দুর্নীতিরোধে তিন মাস পরপর তাদের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তনও করা হচ্ছে। আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমে জনবল বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য তিনি আবেদনও করেন। হাসপাতালে নিযুক্ত গাড়ি চালকদের নিয়মিত ডোপ টেস্টেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এক সময় হাসপাতালের রোগীদের মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে নানারকম হয়রানির অভিযোগ ওঠতো। মেডিকেল সার্টিফিকেট পেতে হাসপাতালে দিনের পর দিন দৌঁড়ঝাঁপ দিতে হতো। সার্টিফিকেট পেতে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হতো সংশ্লিষ্ট রোগীকে। বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূইয়া দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই হয়রানি বন্ধ হয়েছে। আগে যেখানে ১২শ’ থেকে দেড় হাজারের মতো মেডিকেল সার্টিফিকেট ইস্যূর জন্য পেন্ডিং ছিল, সেটি কমিয়ে ৩শ’র নিচে আনা হয়েছে। এছাড়া রোগীর বিদায়কালীন ছাড়পত্র সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নার্সিং কর্মকর্তারা বিতরণ করার নির্দেশ দেন পরিচালক। ফলে ছাড়পত্রের জন্য রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে না।
ওসমানী হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়ে রোগী, তাদের স্বজন ও সিলেটের সুধীমহল থেকে আগে অনেক প্রশ্ন ওঠতো। এই অবস্থায় বর্তমান পরিচালক দায়িত্ব নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যাপারে বিশেষ মনযোগ দেন। তার চেষ্টায় হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারে কমিটি গঠন করেন এবং হাসপাতালে সিসি ক্যামেরার সংখ্যা বৃদ্ধি ও পুরনো অচল ক্যামেরাগুলো সচল করা হয়। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয় আনসার সংখ্যা বৃদ্ধির। হাসপাতালের প্রতিটি গেটে নিরাপত্তা জোরদার এবং রোগী ও তাদের স্বজনরা দালাল কর্তৃক প্রতারিত যাতে না হন সে ব্যাপারে সার্বক্ষনিক পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেন পরিচালক।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূইয়া হাসপাতালে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ নিশ্চিতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ট্রান্সফরমার ও থ্রি ফেজ মিটার স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। জাইকার অর্থায়নে হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থা আধুনিকরণ, প্রশাসনিক ভবনের উত্তর পাশের ৬ তলা ভবনে লিফট ও আউটডোর ভবনের জন্য ২টি বেড লিফট সংযোজন এবং বর্তমান লন্ড্রি বিল্ডিংয়ের স্থানে একটি আধুনিক লন্ড্রি বিল্ডিং নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
কাজের মান রক্ষা ও স্বচ্ছতার জন্য হাসপাতালের ১৫তলা বিশিষ্ট ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি ভবনের সিডিউল ও নকশা অনুযায়ী কাজের মান তদারকির জন্য পৃথক কমিটি এবং আইসিইউ ভবনের উপর বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট ভবনের সম্প্রসারণ তদারকির জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করেন পরিচালক। সিলেট সংক্রামক ব্যাধি (আইডি) হাসপাতালের কোটি কোটি টাকা মূল্যের জায়গা অবৈধ দখলদারদের হাত থেকেও মুক্ত করেন তিনি।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান ভূইয়া। আগে হাসপাতালে সুযোগ না পেয়ে ও দালাল দ্বারা প্ররোচিত হয়ে অনেক রোগী বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতেন। বর্তমান পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ধরণের প্যাথলজি পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড ও এক্সরে বিভাগ ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করেন।
রোগীদের কোন পরীক্ষা বিভাগীয় প্রধানদের অনুমতি ব্যতিত বাইরে না পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি। এতে একদিকে যেমনি হাসপাতালের রাজস্ব বাড়ছে, তেমনি রোগীরাও স্বল্প খরচে মানসম্পন্ন পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। হাসপাতালের সেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশনামূলক পোস্টার সাঁটানোর কারণে রোগীরাও সহজে সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। প্রতারণা ঠেকাতে হাসপাতালে মানি রিসিট ছাড়া সবধরণের লেনদেন বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারগুলো সংস্কার ও মেরামত করিয়েছেন পরিচালক।
ডা. মাহবুবুর রহমান ভূইয়ার প্রচেষ্টায় হাসপাতালে নতুন সার্জারি ওয়ার্ড (৩১নং ওয়ার্ড) চালু ও ৫নং পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডকে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। নতুন নতুন ওয়ার্ড চালু হওয়ায় বেড়েছে সেবার মান। হাসপাতালে বেসরকারি এম্বুলেন্স ও অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ করে সরকারি এম্বুলেন্সের সেবার মান বাড়ানো হয়েছে। ফলে সরকারি এম্বুলেন্সের প্রতি রোগীদের আগ্রহ বাড়ছে। হাসপাতালের কার্ডিয়াক/আইসিইউ এম্বুলেন্স চালু করে পরিচালনা নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে।
বর্তমান পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতালের সকল বিভাগের পুরনো (অপ্রয়োজনীয়) নথিপত্র নীতিমালা মেনে ধ্বংস করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। হাসপাতালের দরপত্র প্রক্রিয়া ও ক্রয় কার্যক্রমকে ইজিপি’র আওতায় আনেন। এতে দরপত্র ও ক্রয় কার্যক্রমে শতভাগ স্বচ্ছতা আসে। হাসপাতালের আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্ল্যান্ট স্থাপনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি চাহিদা পত্রও প্রেরণ করেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান ভূইয়া।
কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কমিটির সভায় সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত দিকনির্দেশনাও দিয়ে যাচ্ছেন পরিচালক। এছাড়া বর্তমানে হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরের রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র সরবরাহসহ সেবার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে যেমন চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে বাড়ি ফিরছেন রোগীরা, অন্যদিকে ওসমানী হাসপাতালের সেবার সুনামও ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। যার সর্বশেষ স্বীকৃতি হেলথ সিস্টেম স্ট্রেনদেনিং স্কোরিংয়ে সারাদেশের মধ্যে প্রথম হওয়া।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd