থেমে নেই সড়কে লাশের মিছিল

প্রকাশিত: ৫:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০১৯

থেমে নেই সড়কে লাশের মিছিল

Sharing is caring!

মো.শামসুল ইসলাম সাদিক : সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে, রক্ত ঝরছে অহরহ। সুস্থ সবল মানুষ পঙ্গু হচ্ছে মুহূর্তে। কেউ পা হারাচ্ছে, কেউ হাত হারাচ্ছে, কেউ মাথা ফাটাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হওয়াও সারা জীবনের কান্না হিসাবে একটি পরিবারের কাছে বিবেচিত হয়। এমন মৃত্যুর মিছিল, দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলছে সমানে।  প্রতি বছর সড়কে মৃত্যুর মিছিলে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ, ধূলিস্যাৎ হচ্ছে হাজারো স্বপ্ন, খালি হচ্ছে মায়ের কোল, স্ত্রী হারাচ্ছেন স্বামী, স্বামী হারাচ্ছেন স্ত্রী। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু সাধারণ মানুষই নয় বরং সাংবাদিক, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাসহ বহু কবি সাহিত্যিকও মারা গেছেন বা গুরুতর আহত হচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনা যেন আজ আমাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি। সংবাদপত্রে প্রথমে যে খবরটি চোখের সামনে চলে আসে তা হলো সড়কে দুর্ঘটনা, যার চিত্র বা পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। সেই সংবাদপত্রে থাকে লাশের ছবি। প্রকাশিত ছবি দেখলে মনে হয় যেন সড়কে লাশের মিছিল হচ্ছে। প্রশ্ন হলো সড়কে লাশের মিছিল বন্ধ হবে কবে? আর কত প্রাণ বিনাশ হলে, আর কত রক্ত ঝরলে, লাশের মিছিল আর কত বড় হলে থামবে সড়ক দুর্ঘটনা বা হ্রাস পাবে? এমন কেউ কি নেই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার? বিষয়টি মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রশ্ন হল সড়কে এসব অনিয়ম থাকবে আর কতকাল? সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের আহাজারি আর কতকাল? সড়কে লাশের মিছিল বন্ধ হবে কবে? এটা শুধু শুধু সড়ক দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দেবার নয়।
অতি আত্মবিশ্বাস, ওভারস্পিডে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রোড ডিভাইভার না থাকা, ট্রাফিক আইন ও ট্রাফিক সাইন না মানা, অদক্ষ চালক, রাস্তার ত্রুটি, যাত্রী সাধারণের অসচেতনতা, নিয়ম বহির্ভূত রাস্তা চলাচল ও পারাপার, গাড়ি চালানো ও রাস্তা পারাপারে মোবাইল ফোন ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন, ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনবিহীন, আইন লঙ্ঘন প্রবণতা ও অবৈধ যানবাহন সড়কে উঠে আসাকে বিশেষজ্ঞগণ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে কোন জিনিসের মূল্যকম? এ প্রশ্নের জবাবে একবাক্যে বলা যায়-মানুষের জীবন। আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি খুন হচ্ছে মানবসন্তান। ¯্রষ্টার সৃষ্টির সর্ব¯্রষ্টে জীব হলো মানুষ। অথচ আজ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নতি হলেও কমছেনা সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক পথ হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। সড়ক দুর্ঘটনা আজ যেন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা তার সন্তানকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হয় কখন তার সন্তান নিরাপদে তার কোলে ফিরে আসবে? না সড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অফিস-আদালত, শিক্ষা- প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, হাট-বাজার তথা যাবতীয় কর্মস্থল থেকে কত মানুষের ঘরে ফেরা হয়না-তার হিসেব নেই। আত্মীয়-স্বজন তার ফেরার অপেক্ষায় থাকে, অস্থির হয়ে খোঁজে। না জানি কোন সময় হাসপাতালের মর্গ থেকে তার লাশ নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। কী হৃদয়বিদারক এসব দৃশ্য। মানুষ মরণশীল। কিন্তু তাই বলে সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে মানুষ মারা যাবে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার দোহাই দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাবার জো নেই। সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো যদি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখব সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ গাড়িতে অতিরিক্ত গতি বা বেপরোয়া গাড়ি চালানো। এছাড়া একটানা (বিরতিহীন) ১২ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো একজন ড্রাইভারের জন্য আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। আমাদের দেশে সড়কের যে সক্ষমতা রয়েছে তাতে ৬০ বা ৭০ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু চালকেরা ১০০ বা ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে যাত্রীবাহী বাস চালিয়ে থাকেন। যানবাহনের মালিক পক্ষের বেশি আয়ের সীমাহীন লোভ আর উদাসীনতা, গাড়ি চালানোর সময় নেশাগ্রস্থ থাকা এবং দায়িত্ব পালনে গাফলতি যানবাহনকে দানবে পরিণত করেছে। অদক্ষ গাড়িচালকদের আনাড়িপনা এবং ফিটনেস বিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্যে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে তা সত্যিই উদ্বেগজক। যে কোনো মূল্যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হবে।
আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অত্যন্ত বেশি, প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে ৮৫ দশমিক ৫। সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে যদি ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায় তাহলে এযাবৎ সড়ক পথেই জীবন দিতে হয়েছে কয়েক লক্ষ মানুষকে। নদীপথে কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে সেই হিসাব ধরলে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। পশ্চিমা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার মাত্র ৩। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অদৃষ্ট নয়; বরং চাইলে উদ্যোগ নিলে, সড়ক ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে সড়কে লাশের মিছিল কমিয়ে আনা সম্ভব। সিঙ্গাপুরে সড়ক দুর্ঘটনার হার খুবই কম। তাদের লক্ষ্য এ হার শূন্যে নামিয়ে আনা। বরং একটিও দুর্ঘটনা না ঘটানো। তারা মনে করেন এটা করা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো কপালের লিখন নয়, সঠিক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করলেই সড়ক দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সুনিশ্চিত। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের দেশে যেসব আইন রয়েছে তা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব। বিশেষ করে ঈদ পর্বে সড়কগুলো মৃত্যুকুপে পরিণত হয়ে যায়। ঈদের ছুটির পর পত্রিকাগুলো লাশের পর লাশের স্বজনদের কান্নার ছবিতে ভর্তি থাকে। ঈদ পর্বে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কতজন মারা গেলেন সে ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। এবারের ঈদযাত্রায় ২০৩ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৪ জন নিহত ও ৮৬৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সড়ক, রেল ও নৌপথে এবারের ঈদে মোট ২৪৪টি দুর্ঘটনায় ২৫৩ জন নিহত ও ৯০৮ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ‘ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন ২০১৯’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গত ১৮ আগস্ট রাজধানীর ঢাকা রির্পোটার্স ইউনিটির মিলনায়তনে যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে এই সকল তথ্য তুলে ধরেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন  বলেছে, সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ৬৭ টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষের কারণে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ। অর্ধেকের বেশি পথচারী গাড়িচাপার শিকার হয়েছেন। দুর্ঘটনায় পথচারী গাড়িচাপার শিকার হয়েছেন ৫২ দশমিক ২১ শতাংশ। আগামি ঈদে মোটরসাইকেল ও পথচারী গাড়িচাপার ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলে দুর্ঘটনার ৮৫ শতাংশ কমে আসবে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে। দু:খজনক হলে সত্য যে, এবারের ঈদ যাত্রায় সড়কে লাশের মিছিলে নিহত ২২৪ জন।
মানব জাতির মৌলিক অধিকার হচ্ছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা। সড়কে লাশের মিছিলের কারণে জনগণ নিরাপদে চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে অবশ্যই সামনের দিকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা সরকারের মহান দায়িত্ব। আর প্রতিশ্রুতি নয়, আশার বাণী নয়- সড়ক দুর্ঘটনা সামলানো হোক, মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হোক- এই মুহূর্তে এটাই হোক বাস্তবায়নের প্রধান কর্মসূচি।

লেখক:
শিক্ষার্থী
এম. সি কলেজ- সিলেট।

মোবাইল : ০১৭২৫-৭২৪৫০৮

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2019
S S M T W T F
« Jul   Sep »
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares