ওসমানীতে বেপরোয়া চোর-দালাল সিন্ডিকেট: শীর্ষে ‘খাদিজা’, জিম্মি অসহায় রোগীরা

প্রকাশিত: ৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ, মে ১, ২০২৬

ওসমানীতে বেপরোয়া চোর-দালাল সিন্ডিকেট: শীর্ষে ‘খাদিজা’, জিম্মি অসহায় রোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট বিভাগের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন চোর ও দালালচক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের প্রতিটি স্তরে সক্রিয় এই চক্রের কারণে প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনরা। সম্প্রতি ফাজিলচিশত এলাকার বাসিন্দা খাদিজা বেগম নামের এক নারীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে হাসপাতাল এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

গত ২৯ এপ্রিল কানাইঘাট থেকে আসা সালমা বেগম নামের এক নারী এই চক্রের শিকার হন। তার কিশোর ছেলে হাড়ের সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি। ওষুধ কিনতে বের হলে খাদিজা বেগম নামের এক নারী সখ্যতা গড়ে তুলে তাকে একটি ফার্মেসির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এরপর ওষুধের স্লিপ ও ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে কৌশলে সটকে পড়েন ওই নারী। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তাকে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সহায়সম্বলহীন সালমা বেগম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের নেপথ্যে রয়েছেন সুবিদবাজার ফাজিলচিশত এলাকার মো. আলীর মেয়ে খাদিজা বেগম। চোর ও দালালি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে তিনি এখন লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক। তার অধীনে বিশাল এক বাহিনী নিয়মিত হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান করে সুযোগ বুঝে রোগীদের টাকা ও মোবাইল হাতিয়ে নিচ্ছে।

চক্রটি শুধু চুরি নয়, বরং ওষুধের স্লিপ জালিয়াতি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমেও প্রতারণা চালাচ্ছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বশির উদ্দিন নামে এক রোগীর স্বজনকে ৩ হাজার ২৬০ টাকার ওষুধ কিনতে প্ররোচিত করে একটি ফার্মেসি। পরে একই ওষুধ অন্য দোকান থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় কেনেন তিনি। অভিযোগ আছে, ২ নম্বর গেটের মালিপাড়া গলির অন্তত ৮টি ফার্মেসি সরাসরি এই দালালচক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। ৭০০ টাকার ওষুধ ৭ হাজার টাকায় বিক্রির নজিরও এখানে রয়েছে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এই অরাজকতার পেছনে রয়েছে এক বিশাল প্রশাসনিক যোগসাজশ। অভিযোগ উঠেছে, দালালরা প্রতিদিন পুলিশকে ৩০০ টাকা এবং আনসার কমান্ডারকে ২০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি পায়। ওয়ার্ডের আয়া, নার্স ও আউটসোর্সিং কর্মচারীদের অনেকেই চুরির মালের ভাগ পান। পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও স্থানীয় পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে মাসিক মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

যদিও পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তারা কাউকে চেনেন না এবং নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের ১, ৩, ৬, ১১, ১৫ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডগুলোতে চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এমনকি স্টাফদের মোটরসাইকেল পর্যন্ত চুরির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ৯০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন আড়াই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনির জানান, অতিরিক্ত জনসমাগম ও রোগীর সাথে আসা স্বজনদের ভিড়ের কারণে দালাল বা চোর চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্যরা।

ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং হাসপাতালের ভেতরে বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে ওসমানী মেডিকেলের এই ‘অরাজকতা’ থামানো সম্ভব নয়।

Sharing is caring!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

May 2026
S S M T W T F
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

সর্বশেষ খবর

………………………..