সিলেট ২৫শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৫ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
প্রকাশিত: ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট নগরীর রাত। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। এমন সময়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসে এক গম্ভীর, ভারী ও ধাতব প্রতিধ্বনি। এই ধ্বনিই সিলেটবাসীর কাছে ‘ডমকা’। এটি কোনো সাধারণ বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ নয়, বরং সাত শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বয়ে চলা আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক।
রমজান মাস এলেই ডমকার গুরুত্ব যেন বহুগুণ বেড়ে যায়। আধুনিক ঘড়ি বা অ্যালার্ম ক্লক যখন ছিল না, তখন সিলেটবাসীর কাছে সময় জানার প্রধান মাধ্যম ছিল এই ডমকা। আজও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেহরির সময় ঘনিয়ে এলে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে যখন ডমকার গম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসে, তখন বোঝা যায় সময় হয়েছে। সেহরির প্রস্তুতি নিতে মানুষ এই ধ্বনির ওপরই নির্ভর করেন।
ডমকা মূলত নকড়া বা নাকাড়া জাতীয় এক ধরনের বিশাল বাদ্যযন্ত্র। তামা বা পিতলের তৈরি বিশাল আকৃতির পাত্রের ওপর শক্ত চামড়া টেনে এটি তৈরি করা হয়। বিশেষ কাঠের মুগুর দিয়ে আঘাত করলেই সৃষ্টি হয় গম্ভীর সুর, যা একসময় শহরের সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যেত।
মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খানের মতে, ডমকা বাজানো কেবল সময় জানানোর বিষয় নয়, এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবহ তৈরির মাধ্যম। তিনি বলেন, “রমজানের শুরু থেকেই ডমকার শব্দ শুনে মানুষ এক অন্যরকম প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিকতা অনুভব করেন। এটি আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক।”
কেবল রমজান মাসেই নয়, দুই ঈদ এবং বার্ষিক ওরস শরীফেও ডমকা বাজানো হয়। শত বছরের পুরোনো এই প্রথা সিলেটের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নস্টালজিয়া ও বর্তমান প্রজন্মের কাছে ডমকা
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন, ডিজিটাল ঘড়ি বা মসজিদের লাউডস্পিকারের জয়জয়কার। মুহূর্তের মধ্যেই এখন মানুষ সময় জানতে পারে। তবুও ডমকার আবেদন কমেনি। শহরের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে ডমকা মানে শৈশবের স্মৃতি, নস্টালজিয়া। তারা বলেন, তখন শহরে এত আলো ছিল না, আধুনিক প্রযুক্তিও ছিল সীমিত। শৈশবের সেই সেহরির আমেজ আজও ডমকার প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে ফিরে আসে।
প্রযুক্তি আমাদের আধুনিক করেছে ঠিকই, কিন্তু ডমকার এই গম্ভীর ধ্বনি প্রমাণ করে দেয়, সময় বদলালেও ঐতিহ্য যদি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তবে তা কখনো হারিয়ে যায় না। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পুণ্যভূমি সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এই ‘জীবন্ত প্রতীক’ আজও জানান দিয়ে যাচ্ছে। সিলেট তার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেই এগিয়ে চলছে।
Sharing is caring!


………………………..

Design and developed by best-bd