জৈন্তাপুর আ’লীগ থেকে লিয়াকত বাবরকে বাদ দেয়ার সুপারিশ

প্রকাশিত: ২:৫৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

জৈন্তাপুর আ’লীগ থেকে লিয়াকত বাবরকে বাদ দেয়ার সুপারিশ

Sharing is caring!

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, খুন, ভারতে অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ এনে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সিলেট থেকে পাঠানো প্রতিবেদন এখন ঢাকায় বিভিন্ন দফতরে। প্রতিবেদনে বর্তমান কমিটি ভেঙে দেয়া এবং লিয়াকত-বাবরকে স্বপদে বহাল না করাসহ তিন দফা সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন ঢাকায় পৌঁছালেও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী।

আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই দল গোছানোর কাজটি শেষ করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের অন্যান্য প্রস্তুতির পাশাপাশি জেলা-উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে দলকে নির্বাচনের উপযোগী করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। দলীয় নেতাদের প্রতিবেদনের পাশাপাশি গোয়েন্দা প্রতিবেদনও চাওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা নিয়ে ঢাকায় প্রতিবেদন পাঠায় সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা। জৈন্তাপুর উপজেলার প্রতিবেদনটি যুগান্তরের হাতে রয়েছে। দুই পৃষ্ঠার গোয়েন্দা প্রতিবেদনের শুরুতেই সাংগঠনিক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে ৪ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেয়া হয়। কমিটিতে সভাপতি করা হয় আলহাজ মো. আবদুল্যাহকে। সহসভাপতি কামাল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন ফয়েজ আহমদ বাবর। এরই মধ্যে সভাপতি মো. আবদুল্লাহ মারা গেছেন। কিন্তু অদ্যাবধি জৈন্তাপুর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়নি।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কমিটি গঠনের পর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমদ বাবর দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে জড়িয়ে পড়েন। তারা দলীয় কার্যক্রমে মনোনিবেশ করেননি, তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে কোনো কাজ করেননি। ব্যক্তিস্বার্থে নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে এলাকায় একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন। যা স্থানীয়ভাবে পরবর্তী সময়ে জনমানুষের মুখে মুখে লিয়াকত বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, লিয়াকত বাহিনী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, পাথর কোয়ারিতে খুন, রাহাজানিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। এই বাহিনীর কর্মকাণ্ড স্থানীয়ভাবে দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি মারাÍকভাবে ক্ষুণœ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ ডিসেম্বর শ্রীপুর পাথর কোয়ারিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে লিয়াকত আলী ও তার অনুসারীদের হাতে এক যুবক খুন হয়। সেই মামলার প্রধান আসামি লিয়াকত আলী ও ২ নম্বর আসামি ফয়েজ আহমদ বাবর বাহিনী নিয়ে আদালতে হাজির হন। ওই ছবি ধারণের সময় দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৮ বছর দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মুখলিছুর রহমান দৌলা রাতে জৈন্তাপুর থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাকচাপায় মারা যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি লিয়াকত আলীর মামাশ্বশুর বেলাল উদ্দিন ওরফে টুল্লা বিলাল। দৌলা খুনের পরের বছরই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন লিয়াকত আলী। তার এ পদে আসীন হওয়া এবং লিয়াকতের মামাশ্বশুর চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ার পর বাদীপক্ষের এ সন্দেহ হয় যে, নিজের পথ পরিষ্কার করতেই লিয়াকত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, লিয়াকত আলীর বাবা মৃত ওয়াজেদ আলী ওরফে টেনাই মিয়া ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার একজন চিহ্নিত রাজাকার ছিলেন। স্থানীয়ভাবে লিয়াকতের বিরুদ্ধে পাথর কোয়ারিতে অবৈধভাবে পরিবেশবিধ্বংসী বোমা মেশিন চালানো, আদিবাসীদের বাড়ি দখল, সুপারিবাগান ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন, মাদক চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ভারতের মেঘালয় রাজ্যে দ্বিতীয় বিবাহ করাসহ সম্পদ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের শেষদিকে লিয়াকত আলীর অতীত-বর্তমান তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, লিয়াকত আলী এক সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ইমরান আহমেদের বাড়ির পাহারাদার ছিলেন। পরে এমপির গাড়ির ড্রাইভারের দায়িত্ব পান। অতঃপর লিয়াকত আলী কিছুদিন সংসদ সদস্য ইমরান আহমেদের পিএসর দায়িত্ব পালন করেন। এই সুবাদে তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক, পরে যুগ্ম সম্পাদক ও সবশেষে দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হন।

প্রতিবেদনে লিয়াকত আলীকে একজন অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ, অসামাজিক সর্বোপরি অশিক্ষিত মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লিয়াকত আলীর কারণে স্থানীয়ভাবে দলের এবং সংসদ সদস্য ইমরান আহমেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন কিংবা এডহক কমিটি গঠন, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের কার্যক্রমকে সচল করা এবং কমিটিতে লিয়াকত ও বাবরকে না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে কিছুই জানি না। কমিটি ভেঙে দেয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাইনি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares