ওসমানীতে আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহ করছে বিতর্কিত দুটি প্রতিষ্ঠান

প্রকাশিত: ১১:০১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০২২

ওসমানীতে আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহ করছে বিতর্কিত দুটি প্রতিষ্ঠান

ক্রাইম ডেস্ক : নিয়ম লঙ্ঘন করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহের জন্য দুটি প্রতিষ্ঠানকে চুড়ান্তকরণের অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী দরপত্রের শর্ত লংঘন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবে হাসপাতাল কতৃপক্ষ দুটি প্রতিষ্ঠানকে জনবল সরবরাহের জন্য চুড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। জনবল সরবরাহে ১১ টি কোম্পানী দরপত্রে অংশ গ্রহণ করে। এর মধ্যে আল-আরাফাত সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড এবং গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে চুড়ান্ত করা হয়। তবে দরপত্র অংশ নেওয়া অপর কোম্পানী নির্বাচিত দুটি কোম্পানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেছে।

তাদের অভিযোগ- দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কোনো কোম্পানীর চেয়ারম্যান/ব্যবস্থাপনা পরিচালক এর নামে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো অভিযোগ/দুদকের মামলা চলমান থাকলে তিনি দরপত্র অংশগ্রহণে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। একই সাথে কল-কারখানা লাইসেন্স আপডেটের কথা উল্লেখ থাকলেও নির্বাচিত দুটি প্রতিষ্ঠানের আপডেট না থাকা স্বত্বেও তাদের অনুকুলে দরপত্র চুড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সাথে মেসার্স আল-আরাফাত ও গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিকবার সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। পল্টন থানায় গাড়ি পোড়ানো একটি মামলায় একজন জেলও খেটেছেন। তাছাড়া, বিভিন্ন স্থানে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে দুটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়।

দরপত্রে অংশ নেওয়া ১১ টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধুমাত্র ‘মাছরাঙ্গা’ কোম্পানীর কল-কারখানা লাইসেন্স থাকার পরও ওই প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজি মোহাম্মদ সেলিম রেজার।

জানা গেছে গেল ২৫ অক্টোবর সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও উপ-পরিচালক সাক্ষরিত স্মারক নং ২০২২/১৯০০ নং পত্রে নভেম্বর ২০২২ ইংরেজি থেকে জুন ২০২৩ ইংরেজী এই আট মাস সময়ের জন্য মেসার্স আল-আরাফাত ও গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড এর নামে চুক্তি সম্পাদনের লক্ষে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ১ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ১ শত ৬০ টাকার বিপরীতে শতকরা ১০ টাকা হারে ১৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা জামানত হিসেবে হাসপাতাল বরাবরে ব্যাংক ড্রাফট প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়। একই ভাবে অপর প্রতিষ্ঠান গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড এর নামেও একই নির্দেশনা প্রেরণ করা হয়। নির্দেশে জনবল হিসেবে ১০ টি পদের বিপরীতে দুটি প্রতিষ্ঠানকে সমান সংখ্যক ২৬২ টি জনবল সরবরাহের কথা উল্লেখ করা হয়।

এদিকে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে আদেশনামা জারির দু’দিন পর ২৭ অক্টোবর সিলেট ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক বরাবরে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় জনবল সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন দরপত্রে অংশ গ্রহণ করা প্রতিষ্ঠান যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজি মোহাম্মদ সেলিম রেজা। অভিযোগ পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় জনবল সরবরাহের নিমিত্তে গত ০৪/০৭/২০২২ ইং তারিখে ওমেকহাসি/ শাখা/আউটসোর্সিং/২০২২/১২৬২/১২ নং স্মারকে আপনার দপ্তরের আহ্বানকৃত দরপত্রে আমার প্রতিষ্ঠান যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিঃ অংশগ্রহণ করে। উক্ত দরপত্র সিডিউলের ৫নং শর্তে উল্লেখ আছে যে, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী কোন প্রতিষ্ঠানের মালিক বা চেয়ারম্যান এর বিরুদ্ধে কোন প্রকার অর্থসংক্রান্ত মামলা, দুদক এর মামলা বা কোন প্রকার মামলা থাকিলে উক্ত প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য দর প্রস্তাবকারী হিসাবে বিবেচিত হইবে।’

দরপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, জনবল নিয়োগ সংক্রান্ত এই দরপ্রস্তাবটি শুধুমাত্র একটি প্যাকেজে এবং একটি লটে আহ্বান করা হয়। কিন্তু সিডিউলের শর্ত ও পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে উল্লেখিত কাজটি ২টি প্রতিষ্ঠানকে ভাগ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয় আরাফাত সিকিউরিটি সার্ভিস ও গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেড নামীয় দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান যথাক্রমে আবু তালেব বেলায়েত ও এসবিএস খান স্বপন গাড়ি পোড়ানোসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামী বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আরাফাত সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড এর চেয়ারম্যান আবু তালেব বেলায়েত। তিনি বলেন, গাড়ি পোড়ানো কেন, আমার নামে বাংলাদেশের কোথাও একটি মামলারও অস্তিত্ব নেই। কল-কারখানা লাইসেন্স আপডেট বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ এই অভিযোগটিও মিথ্যা’।তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় সিলেটে দায়িত্ব পালন করছেন ছাত্রলীগ নেতা জাওয়াদ খান। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে জাওয়াদ খান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না’। তবে এ সময় মোবাইল বার্তায় তিনি জাকির নামের একজনের মোবাইল নাম্বার দিয়ে তার সাথে কথা বলার অনুরোধ করেন।

তবে গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেড এর চেয়ারম্যান এসবিএস খান স্বপন বলেন, ‘প্রথমত আমি ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক এর কোনোটিই নয়। দ্বিতীয়ত ২০১৫ সালে রাজনৈতিক কারণে আমার উপর একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্তক্রমে মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমানীত হয়েছে। এখন মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।’

স্বপন খান বলেন, আমি কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা থাকলেও মামলা পরবর্তী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করি। সুতরাং গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেড এর সাথে বর্তমানে জড়িত কেউই মামলার আসামী নন। তিনি বলেন, মুলত অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানটি গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেড সম্পর্কে কোনোকিছু না জেনেই প্রতিহিংসা বশত এই মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

স্বপন বলেন, সিলেটে কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন ছাত্রলীগ নেতা আবদুল বাছিত রুম্মান। তবে সিলেটে কোম্পানীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আবদুল বাছিত রুম্মান। এর একটু পরই এসবিএস খান স্বপন মোবাইল বার্তায় সিলেটে টিপু নামের একজনের সাথে বিস্তারিত কথা বলার অনুরোধ করেন।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, জনবল নিয়োগে হাসপাতালে গঠিত কমিটি সকল তথ্য যাছাই-বাছাই সাপেক্ষে চূড়ান্ত দরপত্র দাতার নামে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করে থাকে। তিনি বলেন, যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস এর অভিযোগে শর্ত লঙ্ঘনের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটি ঠিক নয়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, গালফ সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেড এর চেয়ারম্যান কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসবিএস খান স্বপন এই প্রতিষ্ঠানের কেউ নন। প্রতিষ্ঠানে যিনি চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের নামে কোথাও কোনো মামলা দায়েরের তথ্য বাছাই কমিটি খোঁজে পায় নি। একই সাথে জনবল সরবরাহে চূড়ান্ত মনোনীত দুটি প্রতিষ্ঠানের সকল তথ্য আপডেট থাকায় প্রতিষ্ঠান দুটির অনুকুলে মনোনয়ন চুড়ান্ত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..