সিলেটে ২১ বছর ধরে বিচারাধীন শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলা

প্রকাশিত: ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২

সিলেটে ২১ বছর ধরে বিচারাধীন শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলা

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক: ২০০১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেটে নির্বাচনি জনসভার দিন বোমা হামলা করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)। কিন্তু ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে জনসভাস্থল আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পার্শ্ববর্তী এলাকা ফাজিলচিশতে বিএনপি নেতা ডা. আরিফ আহমদ রিফার বাসায় বোমা তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে নিহত হয় দুই জঙ্গি। দেশব্যাপী আলোচিত এই ঘটনার ২১ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু পরিকল্পিত এই ঘটনার ২১ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পর্যন্ত আলোচিত এই মামলাটির গতি পাচ্ছে না। বর্তমানে এ মামলাটি সিলেটের জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ ট্রাইবুন্যালে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে।

আদালত সূত্র জানায়, জননিরাপত্তা আদালতে মামলাটি ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে স্থানান্তরিত হয়। আলোচিত এই মামলায় মোট ৪৭ জন সাক্ষী রয়েছেন। এ মামলার অন্যতম আসামি জঙ্গি মুফতি হান্নানকে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।

আর মামলাটিতে ইতোমধ্যে হোটেল আল আকসার কর্মচারী সেলিম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেই সাথে এই মামলায় উল্লেখযোগ্য সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল আউয়াল (কোতোয়ালি থানার সাবেক এসআই) ও অভিযোগপত্র দাখিলকারী সিআইডি পুলিশ পরিদর্শক সিলেট ক্যাম্পের সাবেক পুলিশ পরিদর্শক প্রণব কুমার রায়সহ চার জন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগে ২০০৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আদালতে তিনি অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এছাড়াও আলোচিত এই মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মিজানুর রহমান ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. কামাল পারভেজসহ ৩ জন।

সূত্র জানায়, বোমা বিস্ফোরণ ও হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করেন সিলেট কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু আল খায়ের মাতুব্বর। বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার মাস দুয়েক আগে আবু আল খায়ের মাতুব্বর ডা. ডরফার মালিকানাধীন নগরীর বন্দরবাজার এলাকাস্থ মানচুরিয়া কালার ল্যাবে অভিযান চালান। তখন তিনি ছিলেন সিলেট পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি। তার কাছে খবর ছিল, সেখানে বিপুল বিস্ফোরক মজুত ও সন্দেহজনক লোকজন ছিল। বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সময় সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন (ওসি) আবু আল খায়ের মাতুব্বর। তিনি আবু ওবায়দা ও শাকিলকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেফতারের পর শাকিল ওই সময়ে স্বীকার করে, কয়েক মাস আগ থেকে তারা (জঙ্গিরা) সিলেটে অবস্থান করছিল। সুরমা ভ্যালি হোটেলে শাকিল একাধিকবার স্বনামে-বেনামে ছিলেন বলে এই কর্মকর্তা জানান।

জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ ট্রাইবুন্যাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মফুর আলী বলেন, ‘সাক্ষীদের কারণে আলোচিত এই মামলাটি অনেকটা গতিহীন। তবে মামলার কার্যক্রম অনেকটা এগিয়েছে। মামলাটি আরও আগে নিষ্পত্তি হয়ে যেতো, যদি মামলার আসামিদের আদালতের নির্ধারিত তারিখে হাজির করা যেতো।’

যথাসময়ে আসামি হাজির না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মামলার আসামিরা দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দেশের অন্যান্য আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন হওয়ায় তাদের দায়িত্বশীলরা যথাসময়ে সিলেটের ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে পারছেন না। পুরাতন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলে আদালতের কার্যক্রম আরও গতি পাবে।’

আদালত সূত্র আরও জানায়, ‘২০০১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেটে নির্বাচনি জনসভার দিন হামলা করে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)। ওই বছরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ঘটনাস্থল থেকে জনতার হাতে আহতবস্থায় আটক হওয়া হুজির সদস্য মাসুদ আহমেদ ওরফে শাকিল।

২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর গ্রেফতারকৃত মাওলানা আবু সাঈদ সিলেট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা স্বীকার করে। জবানবিন্দতে সাঈদ জানায়, ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরের মধ্যে শেখ হাসিনার শাহজালাল মাজারে সরাসরি যাওয়ার কথা ছিল। পরে তারা খবর পান, শেখ হাসিনা শাহপরাণ মাজারে যাবেন। দুই মাজারে ওঁৎ পেতে থাকার পর তারা জানতে পারেন শেখ হাসিনা জনাসভাস্থলে সরাসরি চলে যাবেন। এরপর জঙ্গিরা জনসভাস্থলের অদূরে ফাজিশচিশত এলাকায় ভাড়া করা একটি মেসে গিয়ে ওঠেন। ওই মেসে রাত ৮টার দিকে বোমাগুলো নাড়াচাড়া করার সময় বিস্ফোরণ হয়।

২০০১ সালের ২ অক্টোবর সিলেটের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং একই বছরের ১১ অক্টোবর ঢাকায় জেইসিতে প্রায় একই তথ্য দেন শাকিল।

আদালতের জবানবন্দিতে শাকিল আরও বলেছিল, ‘ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে তাবলিগ জামাতে যেতাম। ২০০০ সালে এহতেশাম নামের একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার মাধ্যমে পরিচয় হয় ডা. আরিফ আহমদ রিফার সাথে। এহতেশাম আরও জানায়, ডা. আরিফ আহমেদ সিলেটে একটা হাসপাতাল ও সাভারে একটা কোল্ড স্টোরেজ করতে চান। এ জন্য লোক দরকার। সেই পরিচয়ের সুবাধে ২০০১ সিলেটে আসি ও সুরমা ভ্যালি রেস্টহাউসে উঠি। রুমটি ডা. রিফার নামে বুক করা ছিল।’

সিলেটে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় আবু সাঈদ ২০০৬ সালের ১৯ অক্টোবর সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এতে সে ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকায় বসে করা হত্যা পরিকল্পনার বর্ণনা দেয়। জবানবন্দিতে সে বলে, ‘মুফতি হান্নান আমাকে জানায়, শেখ হাসিনা সিলেটে জনসভা করতে যাবেন। তাকে বোমা মেরে হত্যার বিষয়টি আলোচনা হয়। আলোচনায় মুফতি হান্নান, আবু মুসা, লোকমান, জাফর ও আমি ছিলাম।’

আবু সাঈদ আরও বলে, ‘এ কাজের জন্য ছয় জনকে সিলেট আসার জন্য ঠিক করা হয়। আবু মুসা, লোকমান, জাফর, আমিসহ আরও দুইজন (নূর ইসলাম ও ওবায়দা), এই মোট ছয় জন। শাকিলই আমাদের বলে যে. ডা. রিফাকে চেনে, তার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করবে। পরে মোট সাত জন সিলেটে আসি। আবু মুসা ও লোকমান বোমা তৈরির সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে আসে। রাতে সিলেটে পৌঁছাই। শাকিল আমাদের রিকশায় করে ডা. রিফার বাড়িতে নিয়ে যায়।’

মামলার তদন্তে ও গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জবানবন্দিতে ঘটনার সঙ্গে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট হিসেবে মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু সাঈদ, শাকিল, আবু ওবায়দা, শাহজাহান, ডা. আরিফ আহমদ রিফা, আকাশ, আবু মুসা, লোকমান, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের জাফর, আবু বকর, ডালিম, রাজু, অমিত, সবুজ, আলমগীর, এহ্তেশাম ও পুলিশ সদস্য নূর ইসলামের নাম আসে।

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

September 2022
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

সর্বশেষ খবর

………………………..