পরিবহণ শ্রমিকদের দৌরাত্ম : জিম্মি সিলেটবাসী

প্রকাশিত: ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২২

পরিবহণ শ্রমিকদের দৌরাত্ম : জিম্মি সিলেটবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটে পরিবহণ শ্রমিকদের দৌরাত্ম চরম আকার ধারন করেছে। প্রশাসনিক কর্তপক্ষ যেনো তাদেরকে নগর ও জেলার মালিক বানিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা যখন ইচ্ছে তখনই জনসাধারণকে জিম্মি করতে পারে। জনগনের যাতায়াত মাধ্যম যানবাহনের কর্তৃত্ব তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ফলেই তারা জনসাধারণের সাথে যা ইচ্ছে তা করছে। যখন তখন জনগনকে জিম্মি করে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে মেতে ওঠে। ফলে সিলেটের জনসাধারণের নাভিশ্বাস হয়ে ওঠেছে। রাস্তায় পড়ে মরতে ইচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জেলা প্রশাসন ও নগর কর্তৃপক্ষ সিলেটের সড়ক ও জনপথকে যেনো স্থায়ী ‘লিজ’ দিয়ে দিয়েছে পরিবহণ শ্রমিক নামধারী সন্ত্রাসীদের কাছে। তাই তারা নগর ও জেলার যেখানে সেখানে হাজারো অবৈধ স্ট্যান্ড বসিয়ে দেদারছে চাঁদাবাজি করছে। গলাকাটা ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি যখন ইচ্ছে তখনই সিলেটবাসীকে জিম্মি করে রাখতে পারছে। সিলেট নগরের বিভিন্ন রাস্তা দখল করে হাজারো স্ট্যান্ড বসিয়েছে তারা। এসব স্ট্যান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা কামাই করছে পরিবহণ নেতারা। গত বৃহস্পতিবার রাতে পরিবহণ শ্রমিক কর্তৃক সাধারণ নাগরিক ও যাত্রীদের আকস্মিক জিম্মিদশা সিলেটের ইতিহাসে রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বিভিন্ন সময়ের কারফিউকেও হার মানিয়েছে শ্রমিক নামধারীদের অকস্মাৎ এ অবরোধ।
জানা গেছে, পরিবহণ শ্রমিকদের দুপ্রুপের দ্বন্দ্রে জের ধরে সপ্তাহ খাকেন আগে শ্রমিক নেতা ময়নুল ও জাকারিয়াসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি মামলা হয়। পরিবহণ শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে গত ১৪ সেপ্টেম্বর দণি সুরমা থানায় এ মামলা হয়।
এ মামলার ৮দিন পরে পূর্ব কোনো ঘোষনা ছাড়াই ব”হস্পতিবার রাত সাড়ে ৭ টায় হঠাৎ করে নগরের চার দিকে এমনকি নগরের বাইরে সড়কে মহাসড়কে ট্রাক মিনি ট্রাক পাতিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে অবরোদ্ধ করে দেয় সিলেটসীকে। সাধারণ যানবাহন এমনকি রোগীবাহী কোনো অ্যাম্বুলেন্স ও বিদেশ যাত্রীদের গাড়ি পর্যন্ত চলতে দেয়নি পরিবহণ শ্রমিকরা। এমনকি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রাস্তা দু’দিক থেকে অবরোধ করে রাখে তারা। প্রসুতি ও গুরুতর রোগীদেরও গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে যেতে বাধা দেয় তারা। এহেন বেআইনী অবৈধ অমানবিক অবরোধের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শণে ইতিহাস স”ষ্টি করে সিলেটের পরিবহণ শ্রমিক নামধারীরা। অকস্মাৎ এমন কর্মকাণ্ডে দূপাল্লার বাস ও ট্রাকগুলোও আটকা পড়ে যায়। দুর্ভোগে পড়ে অনেককেদীর্ঘরাত পর্যন্ত বাস কাউন্টারগুলোতে বসে থাকতে হয়েছে। অনেক রেমিট্যান্সযোদ্ধার বিদেশের ফাইটও মিস হয়ে যায়। অনেক রোগী ও প্রসূতীকে রাস্তায় পড়ে ছটফট করতে হয়েছে। ফলে দুর্ভোগের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে সিলেট বাসীকে। পূরো তিন ঘণ্টা নগরবাসীকে ভুগিয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয় পরিবহন শ্রমিকরা। প্রশাসনের সাথে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তারা। অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও রাত ১১টা পর্যন্ত সিলেট থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল শুরু হয়নি। নগরজুড়ে দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। ফলে যাত্রী সাধারণকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। অনেক স্থানে আটকে পড়া যাত্রীদের নানা অঘটনের শিকার হতে হয়েছে। পরিবহণ শ্রমিক নামধারী সন্ত্রাসীরা তাদের টাকা কড়ি ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আটরেক পড়া মহিলা যাত্রীরাও শিকার হয়েছেন হেনস্তার। সিলেট জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি মইনুল ইসলাম, সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি জাকারিয়া আহমদ, হিউম্যান হলার শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি রুহুল মিয়া মইনসহ ২০-৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন লেগুনা শ্রমিক মো. শাহাব উদ্দিন। ,মামলায় মারপিট ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এই মামলার প্রতিবাদে বৃহস্পটতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় পরিবহণ শ্রমিক নেতা ময়নুল ও জাকারিয়ঢার নির্দেশে নগর ও নগরে বাইরের প্রািতটি মোড়ে হঠাৎ করে ট্রাক মিনিবাস পাতিয়ে বাস্তা ব্যক করে দেয় পরিবহণ শ্রমিকার। যানবাহন বন্ধ রেখে সিলেট নগরের বিভিন্ন মোড়ে অবস্তান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে তারা। রাত ৮টার দিকে নগরের উপশহর, শাহী ঈদগাহ, বালুচর, টিলাগড়, হুমায়ূন রশীদ চত্বরসহ বিভিন্ন মোড়ে পরিবহন শ্রমিকরা টায়ারে আগুন দিয়ে বিােভ করেন।
দণি সুরমা থানা পুলিশ জানায়, পরিবহন শ্রমিকদের দুটি গ্রুপ রয়েছে। দুই গ্রুপের বিরোধের জেরে থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। একটি মামলায় পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আসামি করা হয়েছে।
মামলার ৮ দিন পর অকস্মাৎ অবরোধে নামার বিষয়ে সিলেট জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার বিষয়টি আমরা আজই জানতে পেরেছি। আজ কয়েকজন শ্রমিক পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে এ ব্যাপারে দেখা করতে যান। তিনি তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন।’
মইনুল বলেন, ‘যিনি আমাদের নামে মামলা করেছেন, তাকে আগেই শ্রমিক সমিতি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আমাদের নামে চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের অভিযোগে মিথ্যে মামলা করেন। পুলিশও কোনো তদন্ত ছাড়াই মামলাটি গ্রহণ করে।’এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘মামলার বিষয়টি জানতে পেরে শ্রমিকরা বিুব্ধ হয়ে উঠছে। তারা বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। পুলিশ কমিশনারের অপসারণ ও মামলা প্রত্যাহার না হলে আন্দোলন চলবে।’
এ বিষয়ে দণি সুরমা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন কুমার চৌধুরী বলেন, ‘দুই গ্রুপের শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে থানায় দুটি মামলা হয়েছে। পুলিশ মামলাগুলো তদন্ত করছে। মামলার এতদিন পর পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলন অযৌক্তিক।’
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে যান বাসদ নেতা প্রণব জ্যোতি পাল। তিনি বলেন, ‘সব বাস বন্ধ রয়েছে। কেউ টিকিট বিক্রি করছে না। আচমকা এমন কর্মসূচিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছি।’
সিলেট ওসমানী হাসপাতালে এক প্রসূতি রোগীর অ্যাম্বুলেন্সে আটকে দেয়ার এক ভুক্তভোগী বলেন- মনে হয় কতর্”পক্ষ সিলেটের রোডগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন পরিবহণ শ্রমিকদের কাছে। যখন তখন অবরোধ-ব্যরিকেড স”স্টি করতে পারছে তারা। আর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। বিকল্প যাতায়াত ব্যস্থা দিতে ব্যর্থ প্রশাসন কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে প্রত্যাহার দাবি করেন তিনি। এমন দাবি উঠেছে বিভিন্ন নাগরিক মহল থেকেও।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) সুদ্বীপ দাস বলেন, রাতে দণি সুরমার বাস টার্মিনাল এলাকায় পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সাথে পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকের পর তারা অবরোধ তুলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে এসএমপি, সিলেট-এর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ বলেন, শ্রমিক নেতারা গত ৮ সেপ্টেম্বর একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিলে ১৪ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের মামলা রুজু করা হয়, যা তদতন্তাধীন। কেউ অভিযোগ করলে মামলা রুজু করে তা তদন্ত করে আদালতে সত্য-মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ জন্য মামলার আসামীদের কাছে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হবে এমনটা আইনের কোনো বিধানে নেই। এছাড়া মামলা প্রত্যাহার করার এখতিয়ারও পুলিশের নেই। পরিবহণ নেতারা আমাদের কাছে মামলা রুজুর জন্য জবাবদিহি করতে চান এবং মামলা প্রত্যাহার করতে বললে পুলিশ এখতিয়ার বহির্ভুতভাবে মামলা প্রত্যাহার করতে পারেনি। তাই শ্রমিকরা ক্ষুব্দ হয়ে বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে জনদূর্ভোগ সৃষ্টি করে। আমরা তড়িঘড়ি কোনো অ্যাকশনে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাদের দিয়েই অবরোধ প্রত্যাহার করিয়ে নিয়েছি। তবে শ্রমিক নেতাদের কিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলাগুলো প্রত্যাহারের কোনো আশ্বাস তাদের দেওয়া হয়নি। আইনের গতিতে মামলাগুলোর তদন্ত হবে। তিনি আরো জানান, নগরের চলমান সিএনজি অটোরিশাগুলো সম্পূর্ণ প্রাইভেট। এগুলোর গনপরিহনের কাজে ব্যবহারের বা গণপরিবহণ সার্ভিস দেওয়ার আইনত কোনো বিধান নেই।

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

September 2022
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

সর্বশেষ খবর

………………………..