সুনামগঞ্জ দোয়ারায় বড় ভাইয়ের সার্টিফিকেটে পুলিশে চাকুরী করছেন ছোট ভাই!

প্রকাশিত: ৭:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২২

সুনামগঞ্জ দোয়ারায় বড় ভাইয়ের সার্টিফিকেটে পুলিশে চাকুরী করছেন ছোট ভাই!
দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি :: জাল-জালিয়াতিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড নির্মুলে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। সেই বাহিনীর চোখে ফাঁকি দিয়ে ২০০৩ সালে পরিকল্পিত ভাবে পুলিশে চাকুরী নিয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের জুমগাঁও ইসলামপুর গ্রামের মোক্তল হোসেন মজুমদারের পুত্র মোবারক হোসেন। মোবারক হোসেন এর নামের এসএসসি পাশের সার্টিফিকেট থাকার পরও তিনি তার বড় ভাই মোশাররফ হোসেন মজুমদারের দাখিল পাশের সার্টিফিকেট ও নাম দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে চাকুরী করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভয়ঙ্কর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১৯ বছর ধরে তিনি এ চাকুরী করছেন। কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে তিনি এএসআই। এমন অভিযোগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে। এ বিষয়টি তদন্ত করছেন, সহকারী এক পুলিশ সুপার। এ ঘটনায় এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
দায়ের করা লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, জুমগাও ইসলামপুর গ্রামের মৃত মোক্তল হোসেন মজুমদারের ৫ পুত্র ও ৫ কন্যা। তার প্রথম পুত্র বাবুর্চি রুস্তম মজুমদার, দ্বিতীয় পুত্র স্কুল শিক্ষক মিজান মজুমদার, তৃতীয় পুত্র পল্লী চিকিৎসক মোশাররফ হোসেন মজুমদার, পুলিশের এএসআই পদে চাকুরীরত চতুর্থ পুত্র মোবারক হোসেন মজুমদার ও পঞ্চম পুত্র শ্রমিক মোতালিব হোসেন মজুমদার।
বর্তমানে ওই মক্তোল হোসেন মজুমদারের তৃতীয় ও চতুর্থ দুই পুত্রের নাম এখন মোশাররফ হোসেন ও মোশারেফ হোসেন মজুমদার। ব্যবধান শুধু একটি বর্ণের। এদের মধ্যে বড় ভাই মোশাররফ হোসেন মজুমদার থেকে মোশারেফ হোসেন মজুমদার হয়েছেন। আর ছোট ভাই মোবারক হোসেন মজুমদার থেকে হয়েছেন মোশাররফ হোসেন। বড় ভাই মোশাররফ হোসেনের দাখিল পাশের সার্টিফিকেট ও নাম নিয়ে ছোট ভাই মোবারক চাকুরী করছেন পুলিশে। ছোট ভাইয়ের চাকুরী সুরক্ষা দিতে বড় ভাই মোশাররফ তার নামের একটি বর্ন পরিবর্তন করে যুক্ত করে মোশারেফ হোসেন মজুমদার নাম ধারণ করেছেন। যদিও বর্তমানে এনআইডির তথ্য অনুসারে মোবারক এখন পুলিশের এএসআই মোশাররফ আর মোশাররফ এখন মোশারেফ।
২০১৭ সালে এনআইডি সংশোধন করে মোশাররফ থেকে মোশারেফ করা হয়। এনআইডি সংশোধনের পুর্বে ২০১৬ সালে মোশারেফ ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোশাররফ ছিলেন। এমন কি তার স্ত্রী তাসলিমা বেগমের এনআইডিতে স্বামীর কলামে রয়েছে মোশারফ এর নাম। তার মাদরাসা পড়ুয়া মেয়ে ইসরাত জাহান এনীর ভর্তি তথ্যে বাবা মোশাররফই রয়ে গেছেন। এছাড়াও স্থানীয় হকনগর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির তালিকা, সম্প্রতি ইউপি নির্বাচনে সদস্য পদপ্রার্থীর পোষ্টার ও উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের তালিকায় যুগ্ম আহবায়কসহ বিভিন্ন তালিকায় তিনি মোশাররফ নামেই ছিলেন।
২০০০ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দোয়ারাবাজারের বোগলা রুসমত আলী উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে কলেজ) থেকে ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাশ করেন মোক্তল হোসেনের চতুর্থ পুত্র মোবারক হোসেন মজুমদার। যার রোল নম্বর ১০৮৮৬৬ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৩৩১০৮৬। সনদে জন্ম তারিখ ১২মার্চ ১৯৮২ইংরেজী।
তার আপন বড় ভাই মোশাররফ হোসেন ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ঢাকার অধীনে ভূটুয়া শ্রীপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা আনন্দপুর কুমিল্লা থেকে অংশ নিয়ে ১৯৯৬-৯৭ সালে দাখিল পাশ করেন। যার রোল নম্বর ১২২৫৭৮ ও রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ৭৫২৫৯। সনদ অনুযায়ী তার জন্ম তারিখ ৩ জানুয়ারী ১৯৮৪ইংরেজী। বয়স অনুযায়ী মোবারক ছোট হলেও সনদ অনুযায়ী মোশাররফ মোবারকের দুই বছরের ছোট।
পুলিশ কর্মকর্তাসহ দুই ভাইয়ের একই নামের ভয়ঙ্কর জাল-জালিয়াতির তদন্তে মাঠে রয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার (জগন্নাথপুর) সার্কেল শুভাশীষ ধর।
আপন দুই ভাই এখন মোশাররফ এবং মোশারেফ মজুমদার। প্রশ্ন হল মোবারক নামের এসএসসি পাশ সার্টিফিকেটের সেই ব্যক্তি এখন কোথায়? মোশাররফ হোসেন নামে দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে পুলিশের চাকুরী করলেও এলাকায় মোবারকের বড় ভাই ডাক্তার মোশাররফ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তি কে? নামের একটি বর্ণ পরিবর্তনের সাথে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর রহস্য।
জানা গেছে, মোবারক ২০০১ সালে তার এসএসসি পাশ সার্টিফিকেট দিয়ে পুলিশে ভর্তি হলেও অজ্ঞাত কারনে ট্রেনিং এ অংশ নেননি। পরবর্তীতে তিনি পুলিশে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিলে নিজের সার্টিফিকেটে বয়স বেশি হওয়ায় বড় ভাই মোশাররফের সার্টিফিকেট ও নাম ব্যবহার করে ২০০৩ সালে পুলিশে যোগ দেন মোবারক। ওই মোবারক হোসেন এখন এএসআই মোশাররফ হোসেন হয়ে চাকুরী করছেন মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের অধিনস্থ একটি পুলিশ ফাঁড়িতে। চাকুরীতে যোগদানের পর ২০০৭ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রনয়নের সময় নিজের ফিঙ্গার দিয়ে এনআইডিতে স্থায়ীভাবে তিনি মোবারক থেকে মোশাররফ বনে যান।
তার চাকুরীর ১৮ বছর অতিবাহিত হলেও এলাকাবাসি তার নাম মোশাররফ বলে কখনও শুনেন নি। তাকে মোবারক ও তার বড় ভাই পল্লী চিকিৎসক মোশাররফ নামে জানেন এলাকাবাসী।
১২ জুলাই ২০০২ সালে পুলিশে চাকুরী হওয়ার পূর্বে পুলিশ ভেরিফিকেশনের তথ্যে তার নাম মোশাররফ হোসেন ও ডাক নাম মোবারক বলে উল্লেখ করা হয়। এ ভেরিফিকেশনটির তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেন, দোয়ারাবাজার থানার তৎকালিন এসআই মো: আবদুল মতিন। স্থানীয়দের ধারনা, তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে আতাত করে মোবারক নামের এসএসসি পাশের সার্টিফিকেট গোপন রেখে বড় ভাই মোশাররফ এর নামের সার্টিফিকেট অনুযায়ী রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। পরে এ নামেই পুলিশের চাকুরী হয় মোবারকের।
সরজমিন হকনগর বাজারে গেলে পুলিশ কর্মকর্তার বড় ভাই বর্তমান মোশারেফ হোসেন এর সাথে তার দোকানে দেখা হয়। দোকানটির ভেতরে অনেকটাই খোলামেলা ভাবে রাখা হয়েছে ঔষধ। যদিও তার দোকানের সাটারে লিখা রয়েছে মজুমদার ডেকোরেটার্স। এ যেন ডেকোরেটার্স ব্যবসার আড়ালে ফার্মেসীর ঔষধ ব্যবসা। তাও ফার্মেসী ও ঔষধ ব্যবসার প্রয়োজনীয় কোন ডকুমেন্টস তার কাছে নেই।
স্থানীয় সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি দেখে মুহুর্তের মধ্যে বাজার ও এলাকার লোকজন ভিড় করেন। সেখানে সরাসরি যা বল্লেন এলাকাবাসি তাতে মোশাররফের কোনো প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায়নি। বরং তার চোখে মুখে ছিল প্রচণ্ড চাপ।
উপস্থিত স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল কাদির বর্তমান এনআইডির তথ্য অনুসারে তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে প্রথমে পুলিশের নাম তিনি মোবারক বলে ফেলেন।
এলাকার ইয়াছিন আলী, জামাল উদ্দিন, আবদুল জলিল, আবদুল মুমিন, নুরুল হক, আবদুল আহাদ, আলা উদ্দিনসহ লোকজনরা বলেন, মোশাররফ ও মোশারেফ দুই ভাইয়ের নাম এভাবে হতে পারেনা। তারা ছোট বেলা থেকে শুনে আসছেন মোক্তল হোসেন মজুমদারের তৃতীয় পুত্র ডাক্তার মোশাররফ আর চতুর্থ পুত্রের নাম মোবারক। পুলিশে চাকুরী করছে মোবারক আর ফার্মেসী ব্যবসায়ীর নাম মোশাররফ। সম্প্রতি সহকারী পুলিশ সুপার এলাকায় এই বিষয়ে তদন্তে আসার পর থেকে তারা জানতে পারছেন পুলিশে চাকুরী করা মোবারকের নাম মোশাররফ, আর মোশাররফের নাম মোশারেফ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এএসআই মোশাররফ হোসেন বলেন, মোবারক তার ডাক নাম। তার আসল নাম মো: মোশাররফ হোসেন। এ নামে তিনি পুলিশে চাকুরী করছেন। তবে মোবারক নামে বোগলা রুসমত আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করা ব্যক্তি তিনি বলেও এক পর্যায়ে স্বীকার করেন।
পুলিশ কর্মকর্তার বড় ভাই ফার্মেসী ব্যবসায়ী মোশারেফ নামধারী ব্যক্তি বলেন, ছোট বেলায় দাদা-দাদি তার নাম মোশারেফ আর তার ছোট ভাই (পুলিশ) এর নাম রেখেছিলেন মোশাররফ। এ নাম ডাকায় সমস্যার সৃষ্টি হলে মোশাররফ এর পরিবর্তে ছোট ভাইয়ের নাম ডাকা হয় মোবারক। স্কুলেও সে মোবারক নামে ভর্তি হয়েছিল। স্কুলে সার্টিফিকেটে তারা মোবারক নামকে মোশাররফ করায় জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এর আগে মোবারক নামে তার পুলিশে চাকুরী হয়েছে বলে স্বীকার করেন বর্তমান মোশারেফ। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফার্মেসীর ঔষধ ব্যবসার এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তিনি ৬ষ্ট শ্রেনি পর্যন্ত পড়েছেন। পরে তিনি বিদেশে চলে গেলে আর পড়ালেখা হয়নি। ঔষধ ব্যবসার তার কোন সার্টিফিকেট বা প্রশিক্ষণ নেই।
বাংলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার জসিম উদ্দিন সত্যতা স্বীকার করে বলেন, পুলিশে চাকুরী করা ব্যক্তির নাম মোবারক হোসেন মজুমদার আর ফার্মেসীর ব্যবসায়ীর নাম মোশাররফ হোসেন মজুমদার।
অভিযোগ তদন্তকারী কর্মকর্তা, সহকারী পুলিশ সুপার (জগন্নাথপুর) সার্কেল শুভাশীষ ধর বলেন, এএসআই মোশাররফ হোসেন এর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি তিনি তদন্ত করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। সার্টিফিকেটগুলো স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে যাচাই-বাছাই শেষে তদন্ত রিপোর্ট প্রেরণ করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2022
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

সর্বশেষ খবর

………………………..