রায়হান হত্যা কান্ডে পুলিশের পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য, সিলেটে তোলপাড়

প্রকাশিত: ৫:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

রায়হান হত্যা কান্ডে পুলিশের পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য, সিলেটে তোলপাড়

Sharing is caring!

নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেটে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় এসএমপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। তাৎক্ষনিকভাবে আসামীদের গ্রেফতার না করা এবং পুলিশের হেফাজত থেকে প্রধান অভিযুক্ত পালিয়ে যাওয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন এসএমপির কমিশনার গোলাম কিবরিয়া। তবে এসব সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে সিলেট ১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন এসএমপির পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। এর আগে রায়হানের বাড়িতে গত ১৮ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে ঝাঁঝালো বক্তব্য দেন সরকারদলীয় এ প্রভাবশালী নেতা অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মিসবাহ সিরাজের বক্তব্যে সিলেট জুড়ো তোলপাড় বিরাজ করছে।
এমসি কলেজ হোস্টেলে দলবদ্ধ ধর্ষণের আসামীরা শুরুতেই পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের সকলকে আটক করলেও তাতে এসএমপির কোনো ভূমিকাই ছিলো না। বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে রায়হান নামের এক যুবকের  মৃত্যুকে শুরুতে ‘ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত’ বলে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের নির্যাতনে হত্যা দাবি করার পর পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে মূল অভিযুক্ত এসআই আকবর ভূঁইয়াসহ ৭ পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু পালিয়ে যায় মূল অভিযুক্ত আকবর ভূঁইয়া। এসব ঘটনায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন অব্যাহত রাখে। এসব কর্মসূচি থেকে এসএমপির ভূমিকা নিয়ে প্রতিনিয়ত কটাক্ষ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজও পুলিশের ভূমিকারও সমালোচনা করেন। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশের সদর থেকে এসএমপির গাফিলতি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
এমসি কলেজে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় কাউকে গ্রেফতার না করা ও পুলিশ ফাড়িতে নির্যাতনে যুবক নিহত ও প্রধান সন্দেহভাজন এসআই আকবর পুলিশি নজরদারীর মধ্যে পালিয়ে যাওয়া নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়ার পক্ষেই সাফাই গাইলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নিহত রায়হানের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গেলে পুলিশ কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সাড়ে চার বছর ধরে আছেন সেটা তো ভালো। বেশিদিন থাকলে এলাকার হাট ঘাট ভাল বুঝবেন। ভাল সার্ভিস দিতে পারবেন’।
রায়হানের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সান্তনা দেন সিলেট-১ আসনের এই সাংসদ। এসময় রায়হান হত্যার ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন, ড. মোমেন। এসময় তিনি এসআই আকবরকে পুলিশের জন্য লজ্জা উল্লেখ করে বলেন, ‘এরকম দু’একজন কুলাঙ্গারের কারণে পুলিশ বাহিনীও লজ্জিত’।
পররষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, রায়হান হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত পুলিশের এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া (সাময়িক বরখাস্ত) বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, আমার বিশ্বাস আকবর এখনও দেশের বাইরে যায়নি। কারণ সীমান্তগুলোকে আমরা সাথেসাথে সতর্ক করে দিয়েছি। তবে আকবর বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরআগে সিলেটের রাজন হত্যার আসামিকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনা বিয়টি উল্লেখ করেন তিনি। পুলিশের কেউ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে না বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, এই ঘটনায় জড়িত সদস্যদের বাঁচাতে কোনো ধরণের অপচেষ্টা করেনি পুলিশ। আমাদের পুলিশ খুবই দক্ষ। অনেক বড় বড় অপরাধীদের গ্রেফতারে তারা সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনায় একজন ছাড়া বাকী সবাই নজরদারিতে আছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের সবাই এই ঘটনার সুষ্ঠ বিচার চান। এসময় এমসি কলেজে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও পুলিশ ফাড়িতে নির্যাতনে এবং আকবরকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে এসএমপি কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পুলিশ কমিশনারের কোন অদক্ষতা খুঁজে পাননি বলে জানান। সব ঘটনাতেই সিলেটের পুলিশ খুব তৎপর ছিলো। সাড়ে চার বছর ধরে থাকার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বলেন, “বেশিদিন থাকলে তো সুবিধা, তিনি এ এলকার হাট ঘাট ভাল চেনেন, ভাল সার্ভিস দিতে পারবেন”। যদিও গত মাসে এমসি কলেজ হোস্টেলে এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ৮ আসামীর কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি এসএমপি পুলিশ। সব আসামীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপর ‘মহাক্ষ্যাপা’ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাবেক সাংগঠনকি সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। পুলিশি নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদের মায়ের বাড়িতে গত ১৮ অক্টোবর রোববার অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঝাঁঝালো বক্তব্য দেন সরকারদলীয় এ প্রভাবশালী নেতা।
তিনি তাঁর বক্তব্যের পুরোটা সময় রায়হান হত্যার ঘটনায় সিলেট মহানগর পুলিশকে (এসএমপি) অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। রায়হান নিহতের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত এস.আই আকবর নিখোঁজ কেন? সে এখন কোথায় আছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এসএমপি কমিশনারই বলতে পারবেন। এসএমপি কমিশনারের কাছে এসব প্রশ্ন করতে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানান মিসবাহ সিরাজ।
তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি সেলিম মিয়া রায়হান হত্যার আগে থেকেই ছুটিতে। ঘটনার পর থেকে ছুটির মেয়াদ শুধু বাড়িয়েই যাচ্ছেন তিনি। তার থানাধীন এলাকায় এত বড় একটি ঘটনা ঘটলো, অথচ তিনি ছুটিতে! এর কারণ কী?
মিসবাহ সিরাজ বলেন, সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ রায়হানের পরিবারকে শান্তনা দিতে বাসায় এসেছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- প্রশাসনের ডিসি বলেন আর পুলিশ কমিশনার বলেন কেউ আসেননি। পরবর্তীতে আমরা স্মারকলিপি দিয়ে যখন অনুরোধ করলাম, সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসি ও কমিশনারের উপরে চাপ সৃষ্টি করলাম তখন তারা রায়হানের বাড়িতে এলেন, তারা কিন্তু সেচ্ছায় আসেননি।
তিনি বলেন, এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নববধূ গণধর্ষণের ঘটনার পরে জেলা পুলিশ এবং র‌্যাব অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ও মামলার আসামিদের গ্রেফতার করে। কিন্তু ঘটনা ঘটলো এসএমপির শাহপরাণ থানায়, এ থানার পুলিশ অথবা মহানগর পুলিশের কোনো দল কি তাদের আটক করেছে? করেনি। মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেনো এই ধামাচাপা?
তিনি বলেন, আমরা রায়হানের শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের জন্য শপথ নিয়েছি। আজ পরিবারের পক্ষ থেকে ৭২ ঘন্টার যে আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে, তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি। পরিশেষে রায়হান হত্যাকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নজর কামনা করেন অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।
অন্যদিকে রায়হান হত্যার ঘটনায় এসএমপির তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদের পরই পালিয়ে যায় আকবার ভূঁইয়া। পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কিভাবে পালিয়ে গেলো তা নিয়ে নিহতের পরিবার এবং সচেতন নাগরিকদের সমালোচনার মুখে পড়ে এসএমপি। এসআই আকবর ভূঁইয়াক পালিয়ে যেতে সহায়তাকারীদের চিহ্নিত করতে এআইজি মো: আইয়ুবকে প্রধান করে পুলিশ হেড কোয়ার্টার ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে গত সোমবার। কমিটিকে  ৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম ও এসএমপির অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার মোনাদির চৌধুরী।
এদিকে পুলিশ কমিশনার ঘটনার ৪ দিন পর ভিকটিম রায়হানের বাড়িতে যান। এ নিয়েও সমালোচনা হয়। ঘটনার পরপরই সিলেটের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ রায়হানের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান। সকলে ন্যায় বিচারের আশ্বাস দেন। কিন্তু পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া ভিকটিমের বাড়িতে যেতে ৪ দিন সময় নেন। এটাকেও ভালো চোখে দেখছেন না সিলেটের সচেতন মানুষজন। গত রবিবার রায়হানের পরিবারের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেও ‘রায়হান হত্যাকান্ড’ নিয়ে এসএমপি’র একটা স্পষ্ট বক্তব্য প্রদানসহ ৬টি দাবিতে ৭২ ঘন্টার আল্টিমেটামের সময় পেরিয়ে গেলেও  এখন পর্যন্ত কোন দাবিই পূরণ করা হয়নি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares