করোনায় আক্রান্তদের প্রনোদনা স্থগিত, শুধু মৃত্যু হলেই ক্ষতিপূরণ

প্রকাশিত: ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২০

করোনায় আক্রান্তদের প্রনোদনা স্থগিত, শুধু মৃত্যু হলেই ক্ষতিপূরণ

Sharing is caring!

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : খন্দকার জাকির হোসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিচিতি নং-১৫৬১৩) জুনে কর্মরত অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হন। জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) কর্তৃক নমুনা পরীক্ষায় তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে।

চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। পরবর্তীকালে সরকার ঘোষিত ক্ষতিপূরণ পেতে স্বাস্থ্য সচিবের লিখিত পত্রসহ তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। খন্দকার জাকির হোসেনের মতো বিপুলসংখ্যক পুলিশ, আনসার, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার সরকারি চাকুরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছেন।

কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর জানতে পারলেন তারা কেউ আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন না। অর্থাৎ শুধু করোনায় আক্রান্তদের কাউকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। কারণ আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পরিপত্রটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যদি আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা যান, তবেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পরিবারকে দেয়া হবে ক্ষতিপূরণ। ফলে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার ফাইল ভারি হলেও তা আমলে নেয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সূত্র আরও জানায়, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিপিসহ সরকারি নানা পেশা এবং চাকরিজীবীদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত সংখ্যা বেড়েই চলছে। অপরদিকে চলতি বাজেটে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত চাকরিজীবীদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে।

আক্রান্ত প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ দিতে হলে এ অর্থের মাধ্যমে সংকুলান করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। এছাড়া করোনা মোকাবেলায় সরকারের নানামুখী ব্যয় বেড়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যয়গুলো মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, সব নাগরিককে দেখার দায়িত্ব সরকারের। করোনার প্রভাবে কর্মহীন গরিব মানুষকে এই মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারেরও একটি সক্ষমতার বিষয় আছে। সে বিষয়ে লক্ষ রেখে সরকার কাজ করছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, করোনায় আক্রান্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে দুই পরিবারকে। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়াধীন আছে আরেকটি আবেদন। ক্ষতিপূরণ পেয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরীর পরিবার। ৩০ জুন ক্ষতিপূরণ বাবদ মারা যাওয়া সিনিয়র সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরীর পরিবারকে অর্থ বিভাগ থেকে ৫০ লাখ টাকার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় ক্ষতিপূরণের বিশেষ অনুদান ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। সে খাত থেকে এই ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে অর্থ বিভাগ।

দ্বিতীয় ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীন সিলেট এমজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মঈন উদ্দিনের পরিবারকে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ডা. মঈন উদ্দিন মারা গেছেন। ৩০ জুন তার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অর্থ বিভাগ।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়াধীন আছে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক জালাল সাইফুর রহমানের পরিবারের আবেদন। জালাল সাইফুর রহমান করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মৃত ব্যক্তির বেতন গ্রেড অনুযায়ী ৫০ লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব অর্থ সচিবের কাছে দাখিল করা হয়েছে। খুব শিগগির এর অনুমোদন দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, করোনায় আক্রান্ত সরকারি চাকরিজীবী ও মারা যাওয়াদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার লক্ষ্যে ২৩ এপ্রিল অর্থ বিভাগ একটি পরিপত্র জারি করেছিল। সেখানে বলা হয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রথম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তা কেউ করোনা আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ বাবদ পাবেন ৫ লাখ টাকা এবং মৃত্যু হলে পরিবারকে দেয়া হবে ৫০ লাখ টাকা।

গ্রেড ১০ থেকে ১৪ পর্যন্ত চাকরিজীবী আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং মৃত্যু হলে দেয়া হবে সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। আর গ্রেড ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে আক্রান্তদের দেয়া হবে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং মারা গেলে দেয়া হবে ২৫ লাখ টাকা।

অর্থ বিভাগের এই পরিপত্র জারির পর সরকারের নানা পেশাসহ চাকরিজীবীদের আক্রান্ত তথ্যসহ ক্ষতিপূরণ চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি আসা শুরু হয়। অর্থ বিভাগে পাঠানো বাংলাদেশ আনসার বিভাগের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বাহিনীর ৮৮ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। বিভিন্ন থানায় ও ক্যাম্পে কোয়ারেন্টিনে আছেন ১৬ জন। মারা গেছেন ৩ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকায় আছেন ৩০২ জন এবং ঢাকার বাইরে রয়েছেন ৮৬ জন।

এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ২০৩ জন। পেশাজীবী ছাড়াও করোনায় আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন ঝালকাঠির সিভিল সার্জন অফিসের ইপিআই সুপারিনটেনডেন্ট জিকে মতিউর রহমান, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব মো. আবু রায়হান মিঞা (পরিচিতি নং-১৫০৯৩)। এ ধরনের প্রায় শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনার মধ্যে চলতি বাজেট তৈরি করতে হয়েছে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এ সময় অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান থেকে সরকার সরে আসায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কেউ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আবেদন করেননি।

জানা যায়, করোনা মোকাবেলা করতে গিয়ে পুলিশের আট হাজারের বেশি সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ৪০ জনের উপরে। এছাড়া আনসার ও গ্রামপ্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫৫০ জনের বেশি সদস্য আক্রান্ত এবং তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের ১৬৫ এবং কারা অধিদফতরের ৫০ এর বেশি কর্মীও করোনায় আক্রান্ত। এসব আবেদন আসার প্রক্রিয়ায় আছে।

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares