করোনা আতঙ্কে কাছে যায়নি ডাক্তার-নার্স, কানাডা ফেরত ছাত্রীর মৃত্যু

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৬, ২০২০

করোনা আতঙ্কে কাছে যায়নি ডাক্তার-নার্স, কানাডা ফেরত ছাত্রীর মৃত্যু

Sharing is caring!

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : করোনাভাইরাস সন্দেহে চিকিৎসা অবহেলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কানাডাফেরত নাজমা আমিন (২৪) নামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি কানাডায় গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। গত শনিবার দুপুরে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল জটিলতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) তার মৃত্যু হয়।

নাজমা আমিন ছিলেন কানাডার সাসকাচোয়ানের রেজিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শিক্ষার্থী। তিনি গত সোমবার (৯মার্চ) ঢাকায় ফিরে এসে পেটের ব্যথার কথা পরিবারকে জানান।

পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, করোনভাইরাস ছিল বলে সন্দেহ থেকে ডাক্তাররা আতঙ্কে চিকিৎসায় অবহেলা করে। যার কারণে তাদের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।

অভিযোগ করে তরুণীর বাবা আমিন উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার মেয়ে কানাডাফেরত শুনেই ৩-৪ জন ডিউটিরত নার্স ‘করোনা করোনা’ বলে আওয়াজ তোলেন। ওয়ার্ডে শুরু হয় ছোটাছুটি। তার করোনা টেস্ট করা হয়। রিপোর্ট আসার আগে কেউ তার সামনে আসেনি। আমার সামনে মেয়েটার জান গিয়েছে দুপুর ১টায়। বিকেল ৫টায় যখন আইইডিসিআরের রিপোর্টে তার করোনা নেগেটিভ পাওয়া যায়, তখন তার মরদেহ আমাদের দেয়া হয়।”

এর আগে, শনিবার (১৪ মার্চ) ভোর ৬টায় ঢামেকে আনা হয় নাজমাকে। ঢামেকে সার্জারি বিভাগের ২১৯ নম্বর ওয়ার্ডে অধ্যাপক ডা. এ বি এম জামালের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ বি এম জামাল জানান, ‘যখন জানা গেল মেয়েটি কানাডা থেকে এসেছে, জ্বর-কাশি আর শ্বাসকষ্ট ছিল, তখন ওয়ার্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নার্সরাও প্যানিক (আতঙ্কিত) ছিল। পাশাপাশি ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের স্বজনরাও সেখানে ছোটাছুটি শুরু করেন। এরপর আমরা ডিরেক্টর স্যারকে বিষয়টি জানালে তিনি আইইডিসিআরে ফোন দিয়ে দ্রুত কনসালটেন্ট এনে স্যাম্পল (নমুনা) নিতে বলেন। তারা র‌্যাপিড টেস্ট করিয়ে রেজাল্ট দেয়। রেজাল্ট নেগেটিভ ছিল, অর্থাৎ তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন না। তবে রেজাল্ট আসার আগেই তার মৃত্যু হয়।’

তিনি আরও জানান, ‘আমরা সন্দেহ করছি, তার অন্ত্রে ছিদ্র ছিল। অর্থাৎ, তার অন্ত্রের কোথাও ফাটল ছিল। তাকে যখন ভর্তি করা হয়েছিল, তখন তার শরীর থেকে প্রচুর তরল বের হয়ে গেছে।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, নাজমা খেতে পারছিলেন না। প্রতিবার খাওয়ার সময় তার বমি ভাব হয়েছে বা পেটে ভীষণ ব্যথা হয়েছে। ১৩ মার্চ রাতে অসহনীয় ব্যথা হওয়ায় তাকে নেওয়া হয় বাড়ির কাছে মোহাম্মদপুরের একটি হাসপাতালে।

আইসিইউ (ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট) বেড খালি আছে এমন কোনো হাসপাতাল খুঁজে পাচ্ছিলেন না জানিয়ে নাজমার বাবা আমিন উল্লাহ বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বলা হয় তাকে দ্রুত আইসিইউ-এ নেওয়া দরকার। তখন অনেক রাত।’

পরবর্তীতে নাজমাকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি ওয়ার্ডে ভর্তি করে স্যালাইন, অক্সিজেন ও ওষুধ দেওয়া হলে তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। আমিন উল্লাহ বলেন, ‘তার ব্যথাও কিছুটা কমেছিল।’

সকাল আটটায় নার্সদের শিফট বদল হয়। সাড়ে এগারোটার দিকে নতুন নার্সদের একজন জানতে চান নাজমার কী হয়েছে? সমস্যা বলার একপর্যায়ে আমিন উল্লাহ উল্লেখ করেন, তার মেয়ে সম্প্রতি কানাডা থেকে এসেছে।

এই তথ্যটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় নাজমার জন্য। কানাডার কথা উল্লেখ করে নার্স চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘সে কানাডা থেকে এসেছে! তার জ্বরও আছে!’ তারা ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানায় নাজমা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।

এরপর পুরো ওয়ার্ডে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পরে। নাজমার কাছে আর কেউই আসেনি। সব ডাক্তার ও নার্স ওয়ার্ডটি ছেড়ে চলে যায়।

ঢামেক হাসপাতালে করোনাভাইরাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই। পরীক্ষা করার সরঞ্জাম ও চিকিৎসা কর্মীদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাও নেই। তাই তারা রোগীর কাছে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে একজন চিকিৎসক গ্লাভস ও মাস্ক পরে নাজমার কাছে যান। তার হাতে ছিল অ্যান্টিবায়োটিক ভরা একটি সিরিঞ্জ। ততক্ষণে অনেক দের হয়ে গেছে। অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে পুশ করার কিছুক্ষণ পরই নাজমা মারা যান।

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares