প্রশাসনের কথাবার্তাকে পাত্তা দিচ্ছে না চোরকারবারী সিন্ডিকেট চক্র

প্রকাশিত: ৭:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০১৯

প্রশাসনের কথাবার্তাকে পাত্তা দিচ্ছে না চোরকারবারী সিন্ডিকেট চক্র

Sharing is caring!

ঈদুল আজহা পরবর্তী কয়েকদিন কানাইঘাটের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু-মহিষ নিয়ে আসা বন্ধ থাকার পর আবারো চোরাকারবারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কানাইঘাট থানার নবাগত ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম সীমান্ত এলাকা দিয়ে কানাইঘাটে নিয়ে আসা এসব গরু-মহিষের ব্যবসা বন্ধ করার জন্য চোরাকারবারীদের হুশিয়ারি দিলেও প্রশাসনের কথাবার্তাকে পাত্তা দিচ্ছে না চোরকারবারী গরু ব্যবসায়ী ও তাদের সিন্ডিকেট চক্র।
অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে হাজার হাজার গরু মহিষ অবৈধভাবে নিয়ে এসে সড়কের বাজার, দনা, সোনারখেওড়, বড়খেওড়, মুলাগুল এলাকার অনেক চোরাকারবারী রাতারাতি কোটিপতি হয়েছে। সড়কের বাজারকে ঘিরে মূলত ভারতীয় গরু-মহিষের হাট বসে। আর এ হাটে প্রতিদিন কানাইঘাট থানার পুলিশ, জকিগঞ্জ থানা পুলিশ, বিজিবি, ডিবি পুলিশ এবং নিরাপদে ভারতীয় গরু-মহিষের অবৈধ ব্যবসা বহাল রাখার জন্য ক্ষমতাসীন দলের সড়কের বাজার কেন্দ্রিক নেতাদের নামে প্রতি গরু-মহিষ বাবদ ১ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করে থাকে সড়কের বাজারের চিহ্নিত মাংস ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন ও তার সহযোগীরা। প্রকাশ্যে অবৈধ ভারতীয় গরু নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাধা না দেওয়ার জন্য তারা ব্যবসাটি লিজ নিয়েছে বলে চোরাকারবারী গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে।

এদিকে, আবারো গরু-মহিষের ব্যবসা শুরুর পাঁয়তারায় এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণগরু-মহিষের অবাধ বিচরণে গ্রামীণ এলাকার কাঁচা রাস্তাঘাট জনসাধারণের চলাচলে অনুপযোগী হয়ে উঠেছে।

জানা যায়, এ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউপির উজান বারাপৈত গ্রামের শাহজাহান মুদি দোকানী থেকে ভারতীয় রুপির হুন্ডি ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছে। প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, যারা ভারত থেকে গরু কেনেন তাদের কাছ থেকে সকল টাকা জমা নেন তিনি। বিপরীতে ঐ ক্রেতারা শাহজাহানের ভারতে থাকা এজেন্টের কাছ থেকে রুপি গ্রহণ করেন। এ হুন্ডির ব্যবসা করে তিনি রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। স্থানীয় সড়কের বাজারের পশ্চিমে সম্প্রতি ১ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকায় একটি বাড়ি কেনার জন্য দর কষাকষি করছেন বলেও জানা গেছে।

চোরাকারবারী চক্রের মূল হোতা দিঘীরপাড় ইউপি’র দক্ষিণ কুওরের মাটি গ্রামের মাংস ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন অল্পদিনে আলাদিনের ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে থানা এলাকায় পুলিশের সাথে তাকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। তার সাথে সড়কের বাজার এলাকার অনেক গরু ব্যবসায়ীকেও দেখা যায়। শাহাব উদ্দিন এলাকায় হুঙ্কার দিয়ে লোকজনকে বলে, ‘টাকা হলে দুনিয়ার সবকিছু কেনা যায়’। কেউ তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে তার লাঠিয়াল বাহিনী লোকজনকে হুমকি প্রদান করে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, আগে শাহাব উদ্দিন সড়কের বাজারের মাংসের ব্যবসা করত। কয়েক মাস থেকে জড়িয়ে পড়ে ভারতীয় গরু ব্যবসায়। ব্যবসার পাশাপাশি শাহাব উদ্দিন নানা প্রতারণা শুরু করে। সে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে সড়কের বাজার কেন্দ্রিক চোরাকারবারীদের কাছ থেকে গরু প্রতি এক হাজার টাকা করে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করে। তার সাথে পার্টনার হিসেবে রয়েছে করচটি গ্রামের মুসলিম উদ্দিন।

সম্প্রতি শাহাব উদ্দিন ৮৩ লক্ষ টাকা দিয়ে সড়কের বাজারের পশ্চিমে ৪৭ শতক জায়গা ক্রয় করেছে। এছাড়াও ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে তার দুই স্ত্রীর জন্য দু’টি ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত আছে। বিভিন্ন ব্যাংকে তার বড় অংকের টাকা সঞ্চিত রয়েছে।

একই ইউপি’র দিঘীরপাড় গ্রামের চোরাকারবারী শুয়াইবুর রহমান ওরফে সোনাবন্ধু গরু-মহিষের অবৈধ ব্যবসা করে অল্পদিনে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে। নামে-বেনামে সে জমি কিনছে। টাকার জোরে তরুণীদের বিয়েও করছে এই সোনাবন্ধু। সে এক সময় গরুচোর ছিল। তার বিরুদ্ধে থানায় কয়েকটি মামলা রয়েছে। কিন্তু এখন পুলিশের সাথে তার গভীর সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সড়কের বাজারে সে টহল পুলিশকে নিয়ে আড্ডা দেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গরুচোর সোনাবন্ধু এখন এলাকায় দাপট দেখিয়ে চলাফেরা করে। ভারতীয় গরু-মহিষের অবৈধ ব্যবসা করে সোনাবন্ধু ১ কোটি টাকা মূল্যের জমিও কিনেছে।

লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউপি’র সোনারখেওড় গ্রামের চোরাকারবারী আব্দুর রহিমও ৮ লক্ষ টাকার জমি ক্রয় করেছে। সেও বর্তমানে প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালিক। জয়ফৌদ গ্রামের কালা মোল্লার ছেলে আনোয়ার হোসেনও শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছে। কোটিপতি হয়েছে জকিগঞ্জ উপজেলার বাল্লা গ্রামের বাদল, গফুর, রতনগঞ্জ এলাকার বুরহান, কানাইঘাট উপজেলার জয়ফৌদ গ্রামের শরিফ উদ্দিনের পুত্র আব্দুল্লাহ, বড়গ্রামের মঈন উদ্দিনের পুত্র সুলতান আহমদসহ আরো অনেকেই।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার চোরকারবারী শাহাব উদ্দিন, কাপ্তানপুর গ্রামের আব্দুল মনাফের পুত্র সালিক, রফিক, মুসলিম, দক্ষিণ কুওরেরমাটি গ্রামের মনি, খলিল আহমদ, দিঘীরপাড় ইউপির সদস্য কয়ছর আহমদ ও গিয়াস উদ্দিন শতাধিক গরু সীমান্ত পেরিয়ে স্থানীয় সড়কের বাজারে এনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করেছে। এ নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া থাকলেও প্রশাসনের ভূমিকা বরাবরই নিরব ছিল।

থানার নবাগত ওসি যোগদান করার পর ভারতীয় গরু-মহিষের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করতে তৎপর হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ঈদের সময় কয়েকদিন সীমান্ত এলাকা দিয়ে গরু-মহিষ আসা বন্ধ থাকলেও পুণরায় চোরকারবারীরা ভারত থেকে গরু-মহিষ আনা শুরু করেছে। সড়কের বাজারে প্রচুর ভারতীয় গরু-মহিষ আবারো বিক্রি শুরু হয়েছে।

চোরাকারবারী শাহাব উদ্দিন ও হুন্ডি ব্যবসায়ী শাহাজাহান সাথে যোগাযোগ হলে তারা জানায়, আমরা গরু ব্যবসা করছি। চাঁদা উত্তোলনে সড়কের বাজার এলাকার সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতারা জড়িত রয়েছেন। আপনাদের কিছু জানার থাকলে তাদের কাছে জানুন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বার বার বিষয়টি জেলা সমন্বয় ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করেছি।’

থানার নবাগত ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম বলেন, ‘আমি সদ্য থানায় যোগদানের পর থেকে ভারতীয় গরু-মহিষের ব্যবসা বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। পুলিশের সাথে চোরকারবারীদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।’

পুলিশের পক্ষ থেকে ভারতীয় গরু-মহিষ চোরচালান বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবেন এবং পুরো বিষয়টি তিনি মনিটরিং করছেন বলে জানান। জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও সচেতন মহলকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

August 2019
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares