অবৈধ পথে স্পেনে পাড়ি জমানো মাসুমের অবস্থা গুরুতর, দালাল পলাতক

প্রকাশিত: ৮:৩২ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০১৯

অবৈধ পথে স্পেনে পাড়ি জমানো মাসুমের অবস্থা গুরুতর, দালাল পলাতক

বৈধ পথে স্পেন পাঠানোর নামে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার নন্দিরফল গ্রামের জাহিদ আল মাছুম মাসুমের পরিবারের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় দালাল আব্দুল আহাদ। এরপর দালাল টাকা নিয়ে মাসুমকে ছেড়ে দেয় অবৈধ পথে।

শুরু হয় মাসুমের কান্না। কিন্তু দালাল আব্দুল আহাদ রহস্যজনক কারণে আইনের ফাঁকে ছুটে যায়। এই অসহায় পরিবারকে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে দালাল আব্দুল আহাদ দেশের বাহিরে পালিয়েছে।

এদিকে অবৈধ পথে স্পেনে পাড়ি জমানো মাসুমের অবস্থা এখন খুবই গুরুতর। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। ধারদেনা ও সহায়সম্বল বিক্রি করে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সন্তানকে বিদেশ পাঠিয়ে এখন চোখের জল ছাড়া কিছুই নেই অসহায় পরিবারটির।

যেভাবে অবৈধ পথে স্পেন যায় জাহিদ আল মাছুম-

মাসুমের পরিবার সূত্রে জানা যায়, বিয়ানীবাজার উপজেলার আব্দুল্লাপুর গ্রামের দালাল আব্দুল আহাদের সাথে মাসুমকে স্পেন পাঠানোর জন্য আলাপ করেন তারা। পরে মাসুমকে স্পেন পাঠানোর জন্য ধারদেনা ও সহায়সম্বল বিক্রি করে দালাল টাকা দেন। টাকা নিয়েও দালাল আব্দুল আহাদের মাধ্যমে মাসুমকে অবৈধ পথে পাঠায়।

গত ২০১৮ সালের ৩০ জুন দালাল আব্দুল আহাদের সাথে আলাপকালে সে মাসুমের পরিবারকে বলে স্পেনে পৌছার পর টাকা, এর আগে কোন টাকা লাগবে না। তবে ভিসার জন্য ১০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। এ সময় দালালের সাথে কথা ছিল তাকে প্রথমে ইন্ডিয়া, পরে সেখান থেকে ভিসার মাধ্যমে বৈধভাবে স্পেন পাঠানো হবে। এতে সময় লাগবে মাত্র ১৫ দিন।

দালালের কথা অনুযায়ী সহজসরল মাসুম রাজি হয়। পরে দালালরা তাকে প্রথমে ইন্ডিয়ায় নিয়ে এক সপ্তাহ রাখে। এরপর সেখান থেকে তারা আলজেরিয়া নিয়ে যায়। আলজেরিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় মাসুমের উপর নির্যাতন। এই নির্যাতনের খবর শুনে মাসুমের পরিবারে শুরু হয় কান্না। যোগাযোগ করেন আব্দুল্লাপুরের দালাল নাজিমের কাছে।

নাজিম মাসুমের পরিবারকে জানায়, আলজেরিয়ার দালালদের টাকা দেওয়া লাগবে। পরে মাসুমের উপর নির্যাতন বন্ধ করতে নাজিমের কথামতো দালালদের ৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়।

টাকা পেয়ে তারপর দালালরা মাসুমকে প্রায় এক মাস আলজেরিয়ার এক মরুভুমিতে রাখে। সেখানে মাসখানিক থাকার পর মাসুম দালালের সাথে যোগাযোগ করলে সে বলে এভাবে তারা পাঠাতে পারবে না। তারা ভিন্ন পথে পাঠাবে। এতে পরিবারে শুরু হয় দুশ্চিন্তা।

জানা যায়, আলজেরিয়া থেকে ফিরে আসার পথ না পেয়ে দালালরা রাতের আধারে মাসুমকে নিয়ে যায় মরক্কোর বর্ডারে। সেখান থেকে প্রায় ১ দিন তারা জঙ্গলের পথ দিয়ে হেটে নিয়ে যায় মরক্কো। মরক্কোতে তারা প্রায় ১ মাস রাখে। আর তখন থেকেই তার জীবনে শুরু হয় দুর্ভোগ। ঠিক মত খাবার পেত না, একবেলা একটি পাউরুটি দিয়ে ক্ষিদা মিটাতো। এরপর আবার দালালদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা চাপ দেয় তাদের সব গুলো টাকা পরিশোধ করতে হবে। তখন দালালদের দেওয়া হয় আরো পাচঁ লক্ষ টাকা।

মরক্কোর পুলিশের ভয়ে তখন মাসুম কোন মতে দৌড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। দালালরা তাকে রেখে পালিয়ে যায়। প্রায় তিন দিন সে না খেয়ে জঙ্গলে অবস্থান করে। সেখান থেকে দালালের সাথে সে যোগাযোগ করতে থাকে, দালালরা মাসুমকে বলে সে যদি পালিয়ে তাদের কাছে আসতে পারে তাহলে তারা তাকে আশ্রয় দিবে। কিন্তু তখন সে পালাতে গিয়ে মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে যায়।

এরপর শুরু হয় পুলিশী নির্যাতন। তার মোবাইলসহ সব কিছু নিয়ে যায় মরক্কো পুলিশ। মাসুমকে ৩ দিন একটি রুমে আটকে রাখে। মরক্কো পুলিশ তাকে জিজ্ঞেসা করে, তখন সে সব কিছু বলতে থাকে। পরে মরক্কো পুলিশ রাতের আধারে তাকে জঙ্গলে নিয়ে ছেড়ে দেয়। মাসুমকে আলজেরিয়ায় ফিরে যেতে বলে। সে রাতের আধারে জঙ্গলে হাটতে থাকে। জানের ভয়ে দৌড়াতে থাকে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় চটফট করতে থাকে। সে আবার আশ্রয় খুঁজতে থাকে। ভোর হতে না হতে মরক্কোর বর্ডার পুলিশ তাকে আবার আটক হয়। ওই খবর শুনে দালালরা পালিয়ে যায়। সেখানে সে প্রায় ২ দিন বর্ডার পুলিশের হাতে বন্দী থাকার পর ছাড়া পায়।

তারপর সে আবার জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দালাল আর কোন ফোন রিসিভ করে না। এই খবর শুনে দালাল আব্দুল আহাদ তৎক্ষনিক লন্ডন চলে যান। যোগাযোগও করেনি। এরপর সে ৩ দিন জঙ্গলে থাকার পর কিছু আফ্রিকান লোকের দেখা পায়। এমনকি তাদের হাতে পায়ে দরে তাদের সাথে গেইমে যায়। বেলুনে স্পেন এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।

বেলুনের নৌকাটি সাগরের মধ্যে খানে আগুন লেগে ডুবে যায়। এ অবস্থায় প্রায় ৬ ঘন্টা সাঁতরাতে থাকে এবং অচেতন হয়ে পরে স্পেনিশ পুলিশ এসে তাকে হেলিকপ্টার যুগে উদ্ধার করে।

তৎক্ষনিক হাসপাতালে নিয়ে যায়, এবং সেখানে নিয়ে চিকিৎসা করে। তার শরীরের প্রায় বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যায়। তখন ও মাসুমের পরিবার তার কোন খোঁজ পাওয়ানি। হঠাৎ একদিন ফোন আসে পরিবারের কাছে মাসুমকে বাচাঁতে হলে প্রায় তিন লক্ষ টাকার প্রয়োজন। টাকার জন্য মাসুমের চিকিৎসা বন্ধ পরে এক আত্মীয় এর মাধ্যমে আরো ৩ লক্ষ টাকা দিয়ে তাকে চিকিৎসা করানো হয়। বর্তমানে মাসুমের অবস্থা আরো গুরুতর।

এরপর যখন বিয়ানীবাজারের দালালরা জানতে পারে মাসুম স্পেনে চলে গেছে। তখন দালালরা যোগাযোগ করা শুরু করছে। এর আগে প্রায় তিন মাস মাসুমের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন রাখে। পরে মাসুমের বাড়িতে গিয়ে আরো দু লক্ষ টাকা দিতে চাপ সৃষ্টি করে দালাল আব্দুল আহাদ। এমনকি এই অসহায় পরিবারকে হামলা-মামলার ভয় দেখাচ্ছে।

এদিকে এই পরিবারটি ঘর-বাড়ি সবকিছু হারিয়ে একদম নিরুপায় হয়ে আতঙ্কে জীবন-যাপন করছে। দালাল আব্দুল আহাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান তারা।

Sharing is caring!

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..